ইনকিলাব মঞ্চের সর্বাত্মক অবরোধে জনসমুদ্র শাহবাগ
Printed Edition
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল সোমবার বেলা ২টা থেকে অবরোধ শুরুর কথা থাকলেও বেলা ১১টার মধ্যেই তারা শাহবাগ মোড়ে জড়ো হতে শুরু করেন। বেলা ২টার পর শাহবাগ মোড় সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, ফলে আশপাশের এলাকায় সবধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের অবরোধ কর্মসূচি চলছিল।
সরেজমিন দেখা যায়, শাহবাগ মোড়ের মাঝখানে বসে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা ধারাবাহিকভাবে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় তারা ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘গোলামি না আজাদি, আজাদি আজাদি’ এবং ‘যেই হাদি জনতার, সেই হাদি মরে না’- এমন নানা স্লোগান দেন।
এ সময় আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, অনেকেই ঢাকা-৮ আসনে ইনকিলাব মঞ্চের কেউ যাতে নির্বাচন করে, সেই অনুরোধ করছেন। ইনকিলাব মঞ্চ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিকারী সংগঠন। শহীদ ওসমান হাদি ইনকিলাব মঞ্চ থেকে নির্বাচনে অংশ নেননি। তিনি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। আমরা কয়েকজন তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম। শহীদ ওসমান হাদির ইনকলাব মঞ্চ কোনো দিন ক্ষমতার কাছে নিজেকে বর্গা দেবে না। কোনো দিন ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হবে না।
তিনি বলেন, ওসমান হাদি রাজনীতি করতে আসেননি। আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কেমন হবে, সেটি বিনির্মাণ করতে এসেছিলেন। আগামী দিনেও বাংলাদেশের রাজনীতি কেমন হবে, তার রূপরেখা ঠিক করে দেবে ইনকিলাব মঞ্চ।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব বলেন, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকবে; কিন্তু জনগণ আপনাদেরকে হাদি হত্যার বিচারের জন্য পাশে চায়। আপনারা যদি বিচারের জন্য সোচ্চার না হন, আগামী নির্বাচনে জনগণ আপনাদের সোচ্চার করে দেবে।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব বলেন, যারা শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য শহীদ ওসমান হাদির নাম ব্যবহার করতে চায়, তারা সফল হবে না। জনগণ আবেগ দিয়ে নয়, আগের হিসাব ও বর্তমান হিসাব মিলিয়েই ভোট দেবে।
আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, যারা খুনিদের জামিন করিয়েছে কিংবা টকশোতে গিয়ে শহীদ ওসমান হাদিকে গিনিপিগ বলে হেয় করেছে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলটি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আপনি জানাজায় আসবেন; কিন্তু বহিষ্কার করবেন না তা হতে পারে না। কবর জিয়ারত করবেন; কিন্তু দায় নেবেন না তা হতে পারে না।
উপদেষ্টাদের উদ্দেশে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ঢাকা শহরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করছে। আমি মনে করি না বর্তমান কোনো উপদেষ্টা এখানে এসে আমাদের সাথে দাঁড়াতে পারবেন। তারা এখন কম্বলের নিচে। রাষ্ট্র যেন কম্বলের নিচে ঘুমাচ্ছে; কিন্তু জনগণ রাষ্ট্রের পাহারাদার হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে। ওসমান হাদি খুনের সাথে যে রাঘববোয়ালরা জড়িত, তাদের নাম প্রকাশ করুন। জনগণ আপনাদের পাহারা দেবে। আর যদি কোনোভাবে রাঘববোয়ালদের সাথে সমঝোতায় আসেন, আপনারা ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন না। শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলার অপপ্রচার করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শাহবাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলেও এর বিকল্প পথ রয়েছে। এখানে আসা মানুষগুলো কি ভাড়া করে আনা? এই শীতের মধ্যে তারা কি টাকার জন্য বসে আছেন? খুনিদের বিচারের দাবিতে তারা এখানে অবস্থান করছেন। সুতরাং যতই অপপ্রচার চালান, শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এখান থেকে কেউ যাবে না।
আইন উপদেষ্টার সমালোচনা করে আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, গতকালকেও আমরা দেখেছি জুলাইয়ের আসামিদের জামিন দেয়া হয়েছে। মাননীয় আইন উপদেষ্টা আপনার কাছে জানতে চাই- আপনি কোনোভাবে দায় এড়াতে পারেন না। আইন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকে। আপনারা দায় এড়াতে পারেন না।
শাহবাগের এই কর্মসূচি থেকে নতুন করে চার দফা দাবি ঘোষণা করে ইনকিলাব মঞ্চ। দাবিগুলো হলো- ১) শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবার ২৪ দিনের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করা, ২) বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করা, ৩) শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফেরত না দিলে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়া এবং ৪) সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসনে আওয়ামী লীগের দোসরদের বিচারের আওতায় আনা।
এর আগে, ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে গত শুক্রবার দুপুর থেকে শাহবাগ মোড়ে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ইনকিলাব মঞ্চ। এতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেন। শনিবার রাতে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বিভাগীয় শহরগুলোতে সর্বাত্মক অবরোধের ঘোষণা দেন।
গত রোববার রাত ১০টার দিকে শাহবাগ মোড় ত্যাগ করার সময় আবদুল্লাহ আল জাবের বলেছিলেন, ‘সোমবার বেলা ২টায় দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়, কওমি ও আলিয়া মাদরাসা, স্কুল-কলেজ এবং স্বাধীনতাকামী জনগণকে শাহবাগের হাদি চত্বরে এসে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে। প্রয়োজনে এই লড়াই আরো কঠোর হবে।’