রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয়ে অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা : অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকিতে শতাধিক পরিবার

শাহ আলম নূর
Printed Edition

রাজধানীর ব্যস্ত আবাসিক এলাকা সিদ্ধেশ্বরী রোডের রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয় প্রকল্পটি শুরুতে ছিল স্বপ্নের আবাসন, বর্তমানে তা পরিণত হয়েছে আতঙ্কের আবাসনে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, আবাসিক প্রকল্পের কমিউনিটি ভবনকে বেআইনিভাবে ব্যবহার করে সেখানে একাধিক রেস্টুরেন্ট ও সুপারশপ চালু করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগ, এ স্থাপনাগুলো চালুর আগে তাদের মতামত নেয়া তো দূরের কথা, বরং রাজউকের অনুমোদিত নকশা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী কমিউনিটি ভবন ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল আবাসিক উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য। অথচ এখন সেখানে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে গ্রাহক ও ডেলিভারি কর্মীদের ভিড়, শব্দদূষণ ও চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি।

স্বপ্ন নিলয়ের মোট চারটি ভবনে ২০০টিরও বেশি ফ্ল্যাট রয়েছে। এসব ফ্ল্যাটের মালিকরা জানান, তারা ফ্ল্যাট কেনার সময় রূপায়ণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি পান যে কমিউনিটি ভবন শুধুমাত্র বাসিন্দাদের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে। তবে বাস্তবে তা হয়নি। এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করে ফ্ল্যাট কিনেছিলাম। এখন দেখি আমাদের থাকার পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে গেছে। চারতলার কমিউনিটি স্পেসে সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট চালু করে দিয়েছে, অথচ রাজউকের কোনো অনুমোদন নেই। চুক্তির তোয়াক্কা নেই।’

প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ এসেছে তা হলো এ অবৈধ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। স্থানীয়রা বলছেন, ভবনটিতে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, নেই কোনো জরুরি নির্গমন পথ, এমনকি নেই নিয়মিত সিকিউরিটি চেকও।

বাসিন্দারা একাধিকবার রূপায়ণ কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে এ সমস্যা সম্পর্কে অবহিত করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে; বরং কোম্পানির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এ ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা চালু করার জন্য রাজউকের কোনো অনুমোদন নেয়া হয়নি এটি রাজউকও জানে। অনেকেই মনে করেন, স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতি ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এ অবৈধ কার্যক্রম বহাল রয়েছে। একটি ফ্ল্যাট মালিক সমিতির নেতা বলেন, ‘আমরা রাজউককে লিখেছি, ডিপার্টমেন্ট অব ফায়ার সার্ভিসকেও জানিয়েছি, কিন্তু কেউ কানে নেয়নি। যদি বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তার দায় কে নেবে?’

এখানে বাসিন্দারা এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তারা চান অবিলম্বে এ অবৈধ বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করা হোক, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কমিউনিটি ভবন শুধু সামাজিক ও বাসিন্দাদের কাজে ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয়া হোক।

এ কমপ্লেক্সের বাসিন্দারা বলছেন, কমিউনিটি ভবনে ফায়ার হাইড্রেন্ট ও পানির রিজার্ভার নেই। ওয়াসার সরবরাহ লাইনে গেটভাল্ব বন্ধ থাকায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে নেভাতে পানি সঙ্কট দেখা দেবে। এ ছাড়াও গ্যাস সিলিন্ডারের অবৈধ মজুদের তথ্য নেই। কমপ্লেক্সে গ্রিন লাউঞ্জ রেস্টুরেন্টে গ্যাস চেম্বার না থাকায় কিচেন ও বেজমেন্টে সিলিন্ডার মজুদ করে রাখা হয়, যা বিস্ফোরণের ঝুঁঁকি বাড়াচ্ছে। এ দিকে কমপ্লেক্সের প্রায় ১১০ জন ফ্লাট মালিককে এখনো ফ্লাট রেজিস্ট্রেশন করে দেয়নি রূপায়ণ হাউজিং। ১৫ লক্ষ টাকা রেজিস্ট্রেশন বাবদ লাগার কথা বলে এখন ৪০-৫৫ লাখ টাকা চাচ্ছে রূপায়ণ।

এ দিকে ‘রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয় ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ যা ওই আবাসিক প্রকল্পের ফ্ল্যাটের মালিকগনের সমিতি, যথাক্রমে রাজুক, ওয়াসা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাষ্ট্রীয় অগ্নিনির্বাপক সংস্থা, রমনা থানা ও পরিবেশ অধিদফতরে এ মর্মে অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা পাননি।

কমপ্লেক্সের একজন ফ্ল্যাট মালিক নয়া দিগন্তকে বলেন ‘আমরা ১৩০ জন ক্রেতা রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট হতে মোট ১৩০টি ফ্ল্যাট ক্রয় করি এবং রূপায়ণ হাউজিং কর্তৃপক্ষ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয় ফ্ল্যাট মালিকদের নিকট হস্তান্তর করে। রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয় আবাসিক কমপ্লেক্সটি একটি কন্ডোমোনিয়াম প্রকল্প এবং এটি রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত চারটি আবাসিক ভবন এবং তিনতলাবিশিষ্ট একটি কমিউনিটি ভবন রয়েছে।

ভবনগুলো ঘুরে দেখা যায়, কমিউনিটি ভবনের ১ম তলায় হেয়ার ড্রেসার/বিউটি সেলুন এবং ভিডিও শপ, ২য় তলায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা ২টি জিমনেসিয়াম, ৩য় তলায় কমিউনিটি স্পেসসহ অ্যাসোসিয়েশনের কমন সার্ভিসসমূহ রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত নকশা মোতাবেক থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে এ ভবনে রেস্টুরেন্ট সুপারশপ ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে, যা আমাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। একটি ভবনে দেখা যায় গ্রিন লাউন্স রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কোনো গ্যাস চেম্বার না থাকায় তারা কিচেনের মধ্যে সিলিন্ডার রেখে রান্নার কার্যক্রম পরিচালনা করে এ ছাড়াও বেইজমেন্টের সিঁড়িতে প্রায় ১০-১৫টি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার রিজার্ভ করে রেখে দিয়েছে।

স্বপ্ন নিলয় ফ্লাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন সদস্য নয়া দিগন্তকে বলেন- কিছুদিন পূর্বে বেইলি রোডে কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রায় ৪৬ জন মারা যাওয়ার পর থেকে আমরা আরো বেশি করে আতঙ্কিত। একই এলাকায় সিরাজ ক্যাপিটেলেও এ কয়েকদিন আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।

এদিকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাজউকের অভিযানে উক্ত আবাসিক ভবনে অবৈধ স্থাপনার কারনে রূপায়ণকে তিন লাখ টাকা জরিমানা ও অবৈধ অংশ অপসারণের আদেশ দেয়া হলেও এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি। কমিউনিটি ভবনের ছাদে সুইমিংপুলের পাশে ১৫ ফুট উচ্চতার অবৈধ স্টিল স্ট্রাকচার যোগ করে রেস্টুরেন্ট সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যা ১৩০ ফ্ল্যাট মালিকগণের সাথে হওয়া চুক্তির সম্পূর্ণ বরখেলাপ।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডকে কমিউনিটি ভবন বাসিন্দাদের হাতে হস্তান্তর না করে অবৈধভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রির অভিযোগ তদন্তাধীন।

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, তারা অভিযোগ পেয়েছেন। যতদ্রুত সম্ভব তদন্ত করে প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে ভবনগুলোর বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলেও জানান অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে রূপায়ণ গ্রপের চিফ অপারেটিং অফিসার সাইফুল ইসলাম কথা বলতে রাজি হননি। তিনি তাদের গ্রুপের মিডিয়া বিভাগে যোগাযোগের কথা বলেন।

রাজউকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন উক্ত আবাসিক ভবনে অবৈধ স্থাপনার কারণে রূপায়ণকে তিন লাখ টাকা জরিমানা ও অবৈধ অংশ অপসারণের আদেশ দেয়া হয়েছে।