ইরান নিয়ে অচলাবস্থায় দুই বিকল্প ভাবনা ট্রাম্পের
আক্রান্ত হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের হুঁশিয়ারি তেহরানের
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুদ্ধবিরতি চললেও ইরানের সাথে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা না দেখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দু’টি বিকল্পের কথা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। এই বিকল্পগুলোর মধ্যে আছে- হরমুজ প্রণালীতে ইরানি অবরোধ ভেঙে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আবার শুরু করা কিংবা নতুন সামরিক অভিযান। যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের কাছে যে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, তেহরান তার জবাব দেয়ার পর ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতি ‘বড় ধরনের লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। তেহরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে তিনি ‘স্টুপিড’ আখ্যাও দেন।
ইরানের সাথে চুক্তিতে দেশের ভেতর চাপে থাকার কথা অস্বীকার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সোমবার নিজেই ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ আবারো শুরুর ইঙ্গিত দেন। এক মাস আগের যুদ্ধবিরতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, “তারা যে আবর্জনা পাঠিয়েছে তা পড়ার পর এই মুহূর্তে আমি একে সবচেয়ে দুর্বল বলতে পারি, আমি ওটা পুরোটা পড়তেও পারিনি।
তেহরানের সাথে আলোচনা অচলাবস্থায় পৌঁছানোর পর থেকে ট্রাম্প ফের সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছেন বলে আগেই খবর বেরিয়েছিল। নতুন অভিযান নিয়ে সোমবার ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সাথে বসেছেন বলে একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক হেগসেথ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জেনারেল ড্যান কেইন, সিআইএ পরিচালক জন রেটক্লিফসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন বলেও জানানো হয়েছে। অ্যাক্সিওস বলছে, ওয়াশিংটন এখন আগে শনাক্ত করা লক্ষ্যবস্তু, যেগুলোতে এখনো হামলা হয়নি, তার ২৫ শতাংশে হামলা চালানোর কথা ভাবছে। এদিকে ইসরাইলের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার চাইছে, ট্রাম্প ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ উদ্ধারে বিশেষ অভিযানের নির্দেশ দিক। তবে অনেক ইসরাইলি কর্মকর্তারই ধারণা, এ ধরনের অভিযান ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ট্রাম্প হয়তো সে পথে হাঁটবেন না। ট্রাম্প চাইছেন যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সাথে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে। কিন্তু তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সিংহভাগ দাবি মানতে রাজি না হওয়ায় এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় না দেয়ায় ওয়াশিংটন ফের সামরিক অভিযানের চিন্তা শুরু করেছে। কূটনীতি ব্যর্থ হলে ইরানি স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলার হুমকি ট্রাম্পও একাধিকবার দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র তাদের এবারের পাঠানো প্রস্তাব নিয়ে বেশ আশাবাদী ছিল। ইরান তাতে ‘ইতিবাচকভাবে’ সাড়া দেবে এ ভাবনায় ট্রাম্প তেহরানের জবাবের জন্য এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অপেক্ষায়ও ছিলেন। কিন্তু রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলে, এসব শর্ত মানার অর্থ হচ্ছে ‘ট্রাম্পের বাড়াবাড়ির কাছে আত্মসমর্পণ করা’। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্টও ইরানের জবাব প্রত্যাখ্যান করেন। বলেন, ‘আমার এটি পছন্দ হয়নি, এটি যথোপযুক্ত নয়।’ ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু রোববার তিনি জানালেন, ইরানিরা তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। কেননা মার্কিন প্রস্তাবের তারা যে জবাব দিয়েছে সেখানে এ প্রসঙ্গে কোনো কথাই নেই। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, ট্রাম্প ইরান নিয়ে একাধিক বিকল্প ভাবলেও তিনি সম্ভবত চলতি সপ্তাহের চীন সফর শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। আজ তার এশীয় দেশটির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা, ফিরবেন শুক্রবার। এ সফরে বেইজিংয়ের সাথে তিনি ইরান নিয়েও কথা বলবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তেহরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনও ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তিতে পৌঁছাতে ও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত রাখতে তাগাদা দিয়ে আসছে।
হামলা হলে ৯০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের হুঁশিয়ারি ইরানের : এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে জানান, ইরান আবারো হামলার শিকার হলে তাদের পারমাণবিক তৎপরতা চরম মাত্রায় বাড়িয়ে দিতে পারে। ইব্রাহিম রেজায়ি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের ওপর ফের আক্রমণ হলে অন্যতম প্রধান বিকল্প হিসেবে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করা হতে পারে। উল্লেখ্য যে, এই মাত্রাটি একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় স্তরের সমান। রেজায়ি জানান, বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে ইরানের পার্লামেন্টে পর্যালোচনার পরিকল্পনা চলছে।
এই মাত্রাটি মূলত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী মান বা ‘ওয়েপন-গ্রেড’ হিসেবে বিবেচিত। তেহরানের সাথে আলোচনা স্থবির হয়ে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দেশটির বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসার পরপরই এই হুঁশিয়ারি দিল ইরান। নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ছয় বিশ্ব শক্তির সাথে তেহরানের ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনকে সরিয়ে নেয়ার পর গত আট বছরে ইরান প্রায় ১১ হাজার কিলোগ্রাম (২২,০০০ পাউন্ড) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জমা করেছে। ২০০৬ সালে ইরান শিল্প পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে আর বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
তবে জাতিসঙ্ঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা-আইএইএ’র তথ্য বলছে, এই মজুদ সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। ২০১০ সালে ইরান ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণের ঘোষণা দেয়, যা মূলত বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক বিভাজন রেখা। আইএইএ মনে করে, ইরানের মজুদে থাকা ৪৪০ দশমিক ৯ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ। কারিগরিভাবে এটি অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের খুব কাছাকাছি একটি ধাপ। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ২০ শতাংশ থেকে ৬০ বা ৯০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া শূন্য থেকে ২০ শতাংশে নেয়ার চেয়ে অনেক বেশি সহজ। ২০২১ সালের জুনে ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিও স্বীকার করেছিলেন যে, ইরান চাইলেই অনায়াসে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করতে সক্ষম। তবে তিনি তখন ২০১৫ সালের চুক্তিটি পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
‘ইরানে গোপনে হামলা চালায় আরব আমিরাত’ : গত মাসের শুরুর দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানে গোপনে হামলা চালিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের চলমান যুদ্ধের মধ্যেই আরব আমিরাত গোপনে ইরানের বিরুদ্ধে একাধিক হামলা চালিয়েছে। ইরানের লাভান দ্বীপের একটি তেল শোধনাগার ছিল এসব হামলার অন্যতম লক্ষ্য। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলোর বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এই খবর অনুযায়ী, গত এপ্রিলের শুরুর দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় ওই শোধনাগারে হামলা চালানো হয়। এতে সেখানে বড় ধরনের আগুন লাগে এবং স্থাপনাটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর জবাবে ইরান ইউএই ও কুয়েতের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সূত্রগুলোর একটির দাবি, যুদ্ধে আমিরাতের এই সম্পৃক্ততাকে যুক্তরাষ্ট্র নীরবে স্বাগত জানিয়েছিল।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ইরান অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আরব আমিরাতে বেশি হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলকেও ছাড়িয়ে উপসাগরীয় এই দেশটির ওপর দুই হাজার ৮০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। এসব হামলায় আরব আমিরাতের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই ও বাধ্যতামূলক ছুটির ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি দেশটির কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছে উপসাগরীয় কয়েকজন কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা বলেন, আরব আমিরাত এখন ইরানকে এমন এক ‘বেপরোয়া শক্তি’ হিসেবে দেখছে, যে দেশটি প্রবাসী দক্ষ জনশক্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আমিরাতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো দুর্বল করতে চায়। এ দিকে হামলার বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি কিছু জানায়নি। তবে তারা আগের এক বিবৃতির কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে আবুধাবির বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের জবাব দেয়ার অধিকার দেশটির রয়েছে বলে বলা হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক দীনা এসফানদিয়ারি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, উপসাগরীয় কোনো আরব দেশ সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে- এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এখন তেহরান চেষ্টা করবে আরব আমিরাত ও যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা অন্যান্য উপসাগরীয় আরব দেশের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে।
কংগ্রেসে তোপের মুখে পেন্টাগন প্রধান : ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে আইনপ্রণেতাদের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। এই যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা এবং কংগ্রেসের অনুমোদন না থাকায় খোদ রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্যও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
প্রতিরক্ষা ব্যয়ের তদারককারী প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের ক্ষমতাধর বিভিন্ন উপকমিটি ট্রাম্প প্রশাসনের ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত সামরিক বাজেট পর্যালোচনায় একের পর এক শুনানি করছে। এই বাজেটে সামরিক খাতের জন্য ঐতিহাসিক দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, বাজেট আলোচনার মোড় ঘুরে যাবে যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে। ইরান যুদ্ধ বর্তমানে স্থবির অবস্থায় আটকে আছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আসন্ন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা বাজেটের রূপরেখা তুলে ধরবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সেখানে আরো বেশি ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ এবং ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেবেন তারা। ইরানের সাথে যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এসব সমরাস্ত্রের মজুদ বর্তমানে বেশ কমে এসেছে। পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ২৯ বিলিয়ন (২ হাজার ৯০০ কোটি) ডলার ব্যয় হয়েছে।