‘নিরাপদ ও শান্তির নগরী’ গড়তে গাজীপুরে এআই নজরদারির ঘোষণা

ছয় মাসে ৮১২ মাদক মামলা গ্রেফতার প্রায় ১ হাজার কারবারি

Printed Edition
3rd-6
‘নিরাপদ ও শান্তির নগরী’ গড়তে গাজীপুরে এআই নজরদারির ঘোষণা

গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকায় মোট এক হাজার ৮৫৪টি মামলা দায়ের হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন অপরাধে তিন হাজার ২১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি)। একই সাথে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ঝটিকা মিছিল, মাদক, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

মঙ্গলবার গাজীপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন জিএমপির পুলিশ কমিশনার মো: ইসরাইল হাওলাদার।

তিনি জানান, গত ছয় মাসে দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে হত্যা ২০টি, ডাকাতি সাতটি, ছিনতাই ২৮টি, সিঁধেল চুরি ১৬টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ১৭৬টি, মাদক ৮১২টি, অস্ত্র ৬০টি এবং অন্যান্য অপরাধে ৭৩৫টি মামলা রয়েছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, এ সময়ে ১০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ২০ রাউন্ড গুলি, চারটি ম্যাগাজিন, বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র, ৫১ হাজার ৫৬০টি ইয়াবা, ৩৫৭ কেজি ৩৬৫ গ্রাম গাঁজা, প্রায় দুই কেজি হেরোইন, ৫৩০ পিস প্যাথেডিন, দেশী-বিদেশী মদ ও ২৭৬ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের চেষ্টা করছে। এসব ঘটনায় সদর, বাসন, কোনাবাড়ী, গাছা ও টঙ্গী পশ্চিম থানায় মোট সাতটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৯৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া মিছিলে অংশগ্রহণ, সহযোগিতা ও অর্থায়নের অভিযোগে আরো শতাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের প্রকাশ্য বা গোপন কার্যক্রম, প্রচার-প্রচারণা কিংবা অর্থায়ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অপরাধ। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করা হবে।

টঙ্গী পূর্ব থানার পাগাড় বিসিক এলাকায় ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে শক্তি প্রদর্শনের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত ও তদন্তে শনাক্তসহ মোট ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মোটরসাইকেলে মহড়ায় অংশ নেয়া অন্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টঙ্গীসহ মহানগরের বিভিন্ন বস্তিতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে মাজার বস্তি, কেরানীর টেক, ব্যাংকের মাঠ ও এরশাদ নগর বস্তিতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। শীর্ষ মাদককারবারিদের সম্পদের অনুসন্ধানও চলছে।

ছিনতাই প্রতিরোধে চেকপোস্ট, টহল, ব্লক রেইড ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রেফতার হওয়া অধিকাংশ ছিনতাইকারী আগেও একই ধরনের অপরাধে জড়িত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইন, অস্ত্র আইন ও দস্যুতা-সংক্রান্ত ধারায় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

অপহরণ ও হানি ট্র্যাপ প্রতিরোধে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং দ্রুত উদ্ধার অভিযানের ফলে এসব অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি। পুলিশ কমিশনার জানান, মহানগরে বেওয়ারিশ লাশ ফেলে যাওয়ার প্রবণতাও কমেছে। ২০২৩ সালে ৯৪টি, ২০২৪ সালে ৯৬টি এবং ২০২৫ সালে ৮১টি হত্যা মামলা হলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে হত্যা মামলা হয়েছে ২০টি। এর মধ্যে মাত্র একটি লাশের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ নজরদারির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকার কিশোর গ্যাং সদস্যদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ শেষে তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান চালানো হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মো: ইসরাইল হাওলাদার বলেন, অপরাধপ্রবণ এলাকাসহ পর্যায়ক্রমে পুরো গাজীপুর মহানগরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করে অপরাধ সংঘটনের আগেই সতর্কসঙ্কেত পাওয়া যাবে। পাশাপাশি কোনো অপরাধ ঘটলে সেই ফুটেজ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য গাজীপুর মহানগরকে একটি নিরাপদ ও শান্তির নগরীতে পরিণত করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে যাচ্ছে।’