ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন অকার্যকর

Printed Edition
onno-1
স্যাটেলাইট থেকে নেয়া এক ছবিতে ইরানি হামলার পরে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসের একটি ভবন থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে : ইন্টারনেট

মিডল ইস্ট আই

ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত অন্তত এক ডজন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইরানের পাল্টা হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক একদল বিশেষজ্ঞ গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে আয়োজিত এক সম্মেলনে জানিয়েছেন, এই ঘাঁটিগুলোর বর্তমান অবস্থা এতটাই নাজুক যে এগুলো এখন উপকারের চেয়ে ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ‘প্রজেক্ট অন মিডল ইস্ট পলিটিক্যাল সায়েন্স’-এর পরিচালক মার্ক লিঞ্চ জানান, গত এক মাসে ইরান কার্যত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের ভৌত কাঠামোকে অকেজো করে দিয়েছে। গত মাসে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনেও এই ঘাঁটিগুলোকে ‘বসবাসের অনুপযোগী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির এই বিশালত্বের কথা স্বীকার করেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতরটি বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে এবং সেখান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রায় ৯ হাজার সামরিক কর্মকর্তার আবাসস্থল এই নৌঘাঁটিটি ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলগত অবস্থান ধসে পড়েছে। লিঞ্চের মতে, বাহরাইনে আবার পঞ্চম নৌবহর ফিরিয়ে আনা এখন প্রায় অসম্ভব এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে চিরাচরিত প্রভাব ছিল, তার বিকল্প কোনো পথ এখন ওয়াশিংটনের সামনে নেই। উল্লেখ্য যে, এই অঞ্চলে বাহরাইন, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশে মোট ১৯টি ঘোষিত মার্কিন সামরিক সাইট রয়েছে, যেখানে প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য মোতায়েন ছিল।

১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তার যে লেনদেন ভিত্তিক সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে গড়ে উঠেছিল, বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তা বড় ধরনের সঙ্কটে পড়েছে। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট স্টাডিজের সহযোগী পরিচালক শানা আর মার্শাল জানান, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি থাকা বা ইসরাইলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কের প্রচার চালানো এখন উপকারের চেয়ে দায় হিসেবে বেশি দেখা দিচ্ছে।

ইরানের হামলায় এই দেশগুলোর জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বিমানবন্দর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়া প্রমাণ করে যে, আমেরিকার ‘নিরাপত্তা ছাতা’ এখন আর কার্যকর নয়। এর আগে ১৯৯৬ সালে সৌদি আরবের খোবার টাওয়ারে হামলা এবং ওসামা বিন লাদেনের ক্ষোভের মূলে এই মার্কিন ঘাঁটির উপস্থিতিই প্রধান কারণ ছিল।

এ দিকে কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্র্যাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি মনে করেন, চলতি সপ্তাহে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনার ওপর ইরানের হামলা বন্ধের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এই বিষয়টি দেশগুলোকে আশাহত করেছে এবং তারা নিজেদের বঞ্চিত বোধ করছে।

পার্সি ব্যাখ্যা করেছেন, এই ঘাঁটিগুলো ইরানের হামলা ঠেকাতে সক্ষম হয়নি বরং সেগুলো নিজেরাই হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা এখন ভেঙে পড়েছে এবং এর বিকল্প হিসেবে কিছু দেশ ইরানের সাথে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে ইসরাইলের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মতো কোনো মার্কিন ছাড় ছাড়াই দেশগুলো এখন নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থে নতুন কোনো আঞ্চলিক জোটের কথা ভাবতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনা করবে আমিরাত

আলজাজিরা জানায়, সাম্প্রতিক ইরানি হামলার প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের বৈশ্বিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করবে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ। এক পোস্টে তিনি বলেন, আমরা আমাদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুনভাবে বিশ্লেষণ করব এবং নির্ধারণ করব।

গারগাশ জানান, এই পর্যালোচনার অংশ হিসেবে দেশটি অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাকেও পুনর্গঠন করবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন সঙ্কট মোকাবেলায় আরো শক্তিশালী ও স্থিতিশীল থাকা যায়। তিনি বলেন, জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোর যৌক্তিক পুনর্বিবেচনাই আমাদের ভবিষ্যতের পথ।

এ দিকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে অনুষ্ঠাতব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় রুদ্ধদ্বার বৈঠকের কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, একটি চুক্তির জন্য অর্থবহ ‘পয়েন্ট’-এর মাত্র একটি সেটিই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং আমরা এগুলো গোপন বৈঠকে আলোচনা করব। এই পয়েন্টগুলোর ভিত্তিতেই আমরা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছি। প্রেসিডেন্ট আরো যোগ করেন, এটি যুক্তিসঙ্গত এবং সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এর আগে বুধবার (৮ এপ্রিল) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান সঙ্কট নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ ‘পয়েন্ট’ মাত্র একটি সেটিই আছে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।