জুলাই অভ্যুত্থানের ১৮ মাস
পুনর্বাসন ও চিকিৎসায় কতটুকু সফল সরকার?
হাবিবুল বাশার
ঢাকার রাজপথে আবার স্লোগান উঠেছে, তবে তা অধিকার আদায়ের নয়, বরং সেই সব বীরদের স্মরণে যারা দেড় বছর (১৮ মাস) আগে এই জনপদকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছিলেন। গত দেড় বছরে জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবার ও আহতদের জীবনে ফিরেছে এক নতুন বাস্তবতা। কেউ সরকারি আনুকূল্যে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন, আবার কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করে দিন কাটাচ্ছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য ৪০৫ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে। সরকারি তথ্য মতে, ইতোমধ্যে ৮৩৬ জন শহীদের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে এবং তাদের পরিবারকে এককালীন আর্থিক সহায়তা দেয়া শুরু হয়েছে। তবে তৃণমূল পর্যায়ে অনেক পরিবারের দাবি, তালিকাভুক্ত হতে এখনো তাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আহতদের চিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যে ১৫০ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হলেও এখনো অনেকেই উন্নত চিকিৎসার অভাবে ভোগছেন। গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি খরচে অনেককে বিদেশে (যেমন রাশিয়া, থাইল্যান্ড) পাঠানো হলেও, অসংখ্য আহত যোদ্ধা এখনো পঙ্গু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যালে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার অপোয় আছেন।
সাভারের আশুলিয়ায় গুলিতে চোখ হারানো রিকশাচালক বলেন, সরকার থেইকা টাকা পাইছি, কিন্তু চোখ তো ফিরে পাই নাই। কাজ করতে পারি না, পরিবার নিয়ে চলতে কষ্ট হয়। তার মতো কয়েক হাজার আহত যোদ্ধা এখন কর্মসংস্থানহীনতায় ভোগছেন। যদিও ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিশেষ সেল’ থেকে আহতদের চাকরির জন্য সিভি আহ্বান করা হয়েছে, কিন্তু বেসরকারি খাতে এর প্রতিফলন এখনো ধীর।
জুলাই আন্দোলনের সময় আহত হওয়া এবং বর্তমানে কর্মরত এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,আমরা জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমেছিলাম একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের জন্য। দেড় বছরে অনেক পদপে নেয়া হয়েছে সত্যি, তবে শহীদ পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা এবং আহতদের সম্মানজনক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রের উচিত হবে না এই বীরদের কেবল দিবসভিত্তিক স্মরণে সীমাবদ্ধ রাখা।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট রিপোর্ট অনুযায়ী জুলাই আন্দোলনের মোট শহীদ (গেজেট অনুযায়ী) ৮৩৬ জন, (জাতিসঙ্ঘের রিপোর্ট মতে ১৪০০+), আহত যোদ্ধার সংখ্যা আট হাজারের বেশি, বাজেট বরাদ্দ (২০২৫-২৬), ৪০৫.২০ কোটি টাকা।
এক শহীদের বাবা (পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, আজ আমরা অত্যন্ত অসহায় ও ভুক্তভোগী। যখনই কোনো সরকারি কাজে যাই, শুনতে হয়, এরা তো টাকা পেয়েছে, এরা আবার এখানে কেন?’ বিভিন্ন মহল থেকে আমাদের এমনভাবে দেখা হচ্ছে যে, মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের সন্তানদের এই আন্দোলনে অংশ নিতে দেয়া ভুল ছিল। আমার প্রশ্ন একটাই, শহীদ পরিবার হিসেবে আমরা কি আদৌ সেই কাক্সিত সম্মানটুকু রাষ্ট্র ও সমাজের কাছ থেকে পাবো?
মো: ফজলুল করিম জুলাই আহত বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক। ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে যাত্রাবাড়ীতে ১৬৩টি ছররা গুলিতে আহত হন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের ১৮ মাস (দেড় বছর) পার হয়ে গেলেও সরকারি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমার পরিবারের কারো জন্য কর্মসংস্থান বা আবাসনের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। পুনর্বাসন সংক্রান্ত যে আশ্বাসের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও মিলেনি।
সরকারি সাহায্য পেতেও আমাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে যখন এক লাখ টাকা পাই, সেই টাকা তুলতেই আমার ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। এমনকি ৫-১০ হাজার টাকার ক্ষুদ্র উপহারগুলোও আমি পাইনি। বর্তমানে আমি ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে নিজের রিকশাটি বিক্রি করে দিয়েছি। এখন ভাড়ায় রিকশা চালাতে চাইলেও শরীর সায় দেয় না, যেকোনো সময় অসুস্থ হয়ে পড়ি বলে মালিকরা গাড়ি দিতে চায় না। আমার নাম গেজেটে আসার পরও যদি এই দুরবস্থা হয়, তবে যাদের নাম তালিকায় ওঠেনি তাদের কী অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়।
১৯ বছরের ছাত্র ইয়াহইয়া আল হুনাইদি যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের আঘাতে হাত ভেঙে গুরুতর আহত হন। তিনি বলেন, আমি সরকারি অনুদান হিসেবে তিন লাখ টাকা এবং মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছি, তবে সরকার ঘোষিত স্থায়ী পুনর্বাসন বা কর্মসংস্থানের কোনো সুরাহা এখনো হয়নি। পুলিশের আঘাতে আমার হাত ভেঙে গিয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি। হাতে আবারো অস্ত্রোপচার করা লাগবে, কিন্তু সেই মানের কোনো উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা বা সহযোগিতা পাচ্ছি না।
স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সেখানেও ভোগান্তির শেষ নেই। এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে দৌড়াদৌড়ি করতে করতেই সময় চলে যায়। আমরা আসলে একটা স্থায়ী সমাধান ও সঠিক চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশা করি।
জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) কামাল আকবর বলেন, ফাউন্ডেশনে জমা হওয়া ফান্ডের ৯৫ শতাংশ এ পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে, বাকি অর্থ পুনর্বাসনের জন্য যথাক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে। শহীদ পরিবারগুলোকে মাসিক ভাতার আওতায় আনা হচ্ছে। বর্তমানে ৬৩০টিরও বেশি শহীদ পরিবার ভাতা পাচ্ছে এবং অবশিষ্ট শহীদ পরিবারের ভাতাবিষয়ক কাজ চলমান আছে, যা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় করছে। গুরুতর আহতদের মধ্যে কতজনকে এ পর্যন্ত উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে সেই তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হতে সংগ্রহ করতে পারেন।
আর কতজন এখনো অপেমাণ তালিকায় আছেন এ বিষয়ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ তথ্যে আছে।
মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের জুলাই অভ্যুত্থান শাখার উপসচিব জহিরুল ইসলাম বলেন, অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারকে এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। আহত যারা আছে তাদের অনেকের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা করা হচ্ছে। আমাদের তথ্যের আওতায় যারা আছে প্রত্যেকেই চিকিৎসার আওতায় নেয়া হয়েছে বলে আমি জানি যদিও এ তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দিতে পারবে। যারা গেজেটভুক্ত রয়েছে তারা নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন।