গাজা থেকে শ্রীনগর, তেহরান পর্যন্ত এক গভীর ও অন্ধকার সঙ্ঘাত প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়েছে- যা সীমানা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সব আওতা ছাড়িয়ে গেছে। এটি কেবল মুসলমানদের ওপর রাজনৈতিক আক্রমণ নয়; বরং ইসলামের ওপর এবং তার বিশ্বদৃষ্টি, স্মৃতি এবং নৈতিক ভাবনার বিরুদ্ধে একটি সভ্যতার যুদ্ধ।
আজ মুসলিম উম্মাহ নিজেদেরকে সব দিক থেকে অবরুদ্ধ দেখতে পাচ্ছে। এটা কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক চক্রান্তের মাধ্যমে নয়; বরং ইসলামী পরিচিতির নির্যাস বা মৌলিক বিষয়কে বরবাদ করার এক সমন্বিত আদর্শিক আক্রমণ। তিনটি অঞ্চল- ফিলিস্তিন, কাশ্মির এবং ইরান এই বৃহত্তর সঙ্ঘাতের সক্রিয় রণাঙ্গন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে ইহুদিবাদ, হিন্দুত্ববাদ ও পশ্চিমা আধিপত্যবাদ মুসলমানদেরকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে অমানবিক আচরণের মাধ্যমে অপমানিত করছে। এগুলো নিপীড়নের বিচ্ছিন্ন পর্ব নয়; বরং ভয়, কুসংস্কার ও ঐতিহাসিক স্মৃতিভ্রংশের সাথে বোনা বৃহত্তর টেপেস্ট্রির অংশ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইসরাইল গাজায় এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে, যার ফলে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল ও মসজিদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অর্ধলক্ষাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়, যাদের মধ্যে অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। কিন্তু এই সহিংসতার আগে এবং পরে যা ঘটেছিল এবং ঘটছে তা আরো ভয়াবহ অমানবিকীকরণের একটি সুচিন্তিত অভিযান।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গ্যালান্ট ফিলিস্তিনিদের ‘নরপশু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই সঙ্ঘাতকে ‘আলোর সন্তান এবং অন্ধকারের সন্তানদের মধ্যে’ একটি মহাজাগতিক যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেন। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ আরো অনেক দূর এগিয়ে কয়েকজন লোকের কাজের জন্য ‘একটি গোটা জাতিকে’ দায়ী বলে ঘোষণা করেন। এগুলো বাকপটুতামূলক বাড়াবাড়ি নয়; বরং আদর্শিক অস্ত্র। ফিলিস্তিনিদের মানবতা- তথা মানবাধিকার কেড়ে নিয়ে গণহত্যা কেবল সম্ভবই নয়; বরং অনুমোদিত হয়েও ওঠে। অস্ত্র বিক্রি, ভেটো এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তিগুলোর নীরবতা এবং দুষ্কর্মে সহযোগিতা ধ্বংস করার এই লাইসেন্সকে আরো জোরদার করেছে।
ভারতশাসিত কাশ্মিরে একটি ভিন্ন পদ্ধতিতে সভ্যতা বিলোপের প্রয়াস চলছে। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পর থেকে অঞ্চলটিকে পুনরায় কূটকৌশলের মাধ্যমে জনসংখ্যাগত হস্তক্ষেপ এবং সাংস্কৃতিক পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার একটি সামরিক পরীক্ষাগারে পরিণত করা হয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি অনুসারে এই প্রকল্পটি কেবল ‘একত্রীকরণ’ নয়; বরং একটি স্বতন্ত্র মুসলিম পরিচয়কে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জাতি-রাষ্ট্রে জোরপূর্বক আত্তীকরণের প্রয়াস।
এই প্রচারণার আদর্শিক শিকড় হিন্দুত্বের মধ্যে নিহিত। তাদের বিশ্বাস হচ্ছে ভারত হিন্দু সভ্যতার উত্তরাধিকারী একটি দেশ। আরএসএস নেতা মোহন ভাগবত যেমন ঘোষণা করেছিলেন, মুসলমানদেরকে ‘অবশ্যই বুঝতে হবে তারা হিন্দুদের বংশধর।’ ওই ব্যক্তির বিশ্বাস ও মনোভাবের ব্যাখ্যা হলো মুসলমানরা চিরস্থায়ী বহিরাগত। তারা আত্মসমর্পণ করলেই কেবল তাদের সহ্য করা হবে অন্যথায় সার্বভৌমত্ব ছাড়াই অধীনস্থ হয়ে যাবে। এই পরিকল্পনায়, কাশ্মির কেবল ভূখণ্ড হিসেবেই নয়; বরং স্মৃতি এবং যথার্থ অর্থে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
এই অবরোধে ইরান আরেকটি ফ্রন্টের প্রতিনিধিত্ব করছে, কারণ দেশটি পশ্চিমাদের সামরিকভাবে হুমকি দেয় না; বরং অনুমোদিত দৃষ্টান্তের বাইরে চিন্তা করার সাহস করে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরান ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ প্রত্যাখ্যান করেছে, আমেরিকার আধিপত্য অগ্রাহ্য করেছে এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে এমন কারণগুলোর প্রতি সমর্থন দিচ্ছে।
এই কারণে ইরানকে একটি ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’, একটি ‘মধ্যযুগীয় ধর্মতন্ত্র’, এবং ‘সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করা হয়। এই লেবেলগুলো কেবল নীতিগত হাতিয়ার নয়; এগুলো একটি মহাজাগতিক যুদ্ধের অংশ যা ইসলামী শাসনব্যবস্থা, তার প্রতিরোধশক্তি এবং স্বাধীনতাকে অকার্যকর করতে চায়। ইরানের সভ্যতাগত বিরোধিতা তার সব ত্রুটিসহ একটি স্মারক হিসেবে রয়ে গেছে যা পশ্চিমা আধুনিকতার একটি বিকল্প হিসেবে এখনো বর্তমান। সেই স্মারকটিকে পশ্চিমা শক্তি এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা মুছে ফেলতে চায়।
এই তিনটি বিস্ফোরক বিষয়কে সংযুক্ত করে একটি উদীয়মান আদর্শিক অক্ষ হলো রাজনৈতিক ইহুদিবাদ, যা স্থানচ্যুত এবং বর্ণবাদের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে ইহুদি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়; হিন্দুত্ববাদ যেটা ভারতকে একচেটিয়াভাবে হিন্দু সভ্যতার স্থান হিসেবে পুনর্নির্মাণ করতে আগ্রহী; পশ্চিমা ইসলামফোবিয়া, যা ইসলামকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার অথবা আধুনিকতার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করে। এই শক্তিগুলো সম্মিলিতভাবে সামরিক, গণমাধ্যমের মাধ্যমে এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রচারণা চালায়, যাতে মুসলিম প্রতিরোধকে চরমপন্থা, মুসলিম স্মৃতিকে হুমকি এবং মুসলমানদের মর্যাদাকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এখন আমরা যা দেখছি তা পরিমাপিত নিরপেক্ষতা নয়; বরং একটি বিপজ্জনক অধিকার ত্যাগ করা। গাজায় মুসলিমদের রক্তক্ষরণ, কাশ্মিরি মুসলিমদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং ইরানকে যখন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তিলে তিলে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে তখন রাবাত থেকে জাকার্তা পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের রাজধানীজুড়ে নেতারা নীরবতা পালন করছেন। এই বিপজ্জনক নীরবতা শত্রুপক্ষকে সহযোগিতা করার চেয়েও বেশি, এটি অশুভ সঙ্কেত অত্যাসন্ন হওয়ার লক্ষণ এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। যে সভ্যতা একসময় বিশ্বকে আলোকিত করেছিল বাগদাদের গ্রন্থাগার থেকে কর্ডোভার আদালত এবং টিম্বাকটুর একাডেমি পর্যন্ত- এখন অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের নীরবতা আজ কেবল রাজনৈতিক স্বার্থকেই নয়; বরং তার সহানুভূতি, জ্ঞানের সাধনা এবং তার বিশাল মহত্ত্বের উত্তরাধিকারের জন্য প্রসিদ্ধ আত্মার বিশ্বাসকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
দ্য নেশন থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার
mrkmmb@gmail.com