জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশ তথা বিশ্বের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ও অবিস্মরণীয় ঘটনা, যেখানে সার্বিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নেতৃত্বে ছিল আমাদের কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা। এ আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে যত বলি না কেন তা অবশ্যই কম বলা হবে, কারণ জুলাই বিপ্লবে বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষার্থী রাজপথে মিছিল-মিটিং ও প্রতিবাদে সক্রিয় ছিল। ফলস্বরূপ এ বিপ্লবে ১১ নারী যোদ্ধা শাহাদতবরণ করেন। মায়েরা তাদের সন্তানদের স্বেচ্ছায় আন্দোলনে পাঠিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে নিজের পুত্র-কন্যাকে সাথে নিয়ে সশরীরে রাজপথে নেমে এসেছেন ও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। কখনো কখনো এটিও দেখেছি যে, অনেক মা আন্দোলনরত ছেলেমেয়েদের জন্য শুকনো খাবার, পানি এমনকি আর্থিক জোগানও দিয়েছেন। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী শিক্ষক হিসেবে আন্দোলনের কিছু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা না বললে নয়। যখন ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সাঈদ শাহাদতবরণ করল তখন আমাদের রাবিতেও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন উত্তাল অবস্থা ধারণ করছিল।

আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক ১৮ জুলাই প্রথমবারের মতো বর্তমান ভিসি সালেহ হাসান নকিব স্যারের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানে আমরা বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষক অংশগ্রহণ করি। দিনটি ছিল আমাদের জীবনের একটি অত্যন্ত স্মরণীয় দিন। ছাত্রদের আন্দোলনের পাশে সংহতি প্রকাশ করতে পেরে নিজেদের খুব সৌভাগ্যবতী মনে হচ্ছিল। আরো বেশি ভালো লাগছিল এ জন্য যে সারা দেশে আমাদের সন্তানরা যেভাবে নির্যাতিত হচ্ছে এবং জীবন দিচ্ছে, সেই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিজেও শামিল হতে পেরেছি। সেই সময় শুধু একটি ডাকের অপেক্ষায় থাকতাম, কখন ডাক আসবে আর ছুটে যাবো আন্দোলনে। প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সন্তানদের কাছে বিদায় নিয়ে বের হতাম, চার দিকে যে থমথমে অবস্থা, আর বাসায় ফিরতে পারব কি না জানি না, বা কোনো নিশ্চয়তা নেই যে, আমি গুলিবিদ্ধ হবো না বা খুনি হাসিনার পুলিশ আমাকে রাস্তা থেকে তুলে নেবে না।

৩০ জুলাই আমরা রাবি শিক্ষকদের একাংশ লাল কাপড় মুখে বেঁধে প্রতিবাদ র‌্যালি শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ফটকে দাঁড়িয়েছিলাম, সেই অবস্থান কর্মসূচি থেকে একে একে ফ্যাসিবাদবিরোধী বক্তৃতা-বিবৃতি দেয়া হচ্ছিল। আমিও সে দিন কিছু বলার সুযোগ পেয়েছিলাম; কিন্তু দেশব্যাপী নির্বিচারে ছাত্র-ছাত্রীদের রক্ত ঝরানোর কথা মনে করে আমার কথা জড়িয়ে আসছিল। কান্না ধরে রাখতে পারছিলাম না। দেশব্যাপী আমাদের প্রিয় সন্তানদের ওপর আঘাত, হত্যাযজ্ঞÑ সবকিছু যেন বাকরুদ্ধ করে ফেলল। বিভীষিকাময় জুলাই যেন আর শেষ হচ্ছিল না। ক্ষমতার মোহে মানুষ কতটা হিংস্র হতে পারে তা খুনি হাসিনাকে না দেখলে হয়তো কেউ অনুমান করতে পারতেন না।

ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাসে মানবতা সে দিন চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সে দিনগুলোতে যতটা জনবিধ্বংসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাতে বিশ্ববাসী স্তম্ভিত হয়ে পড়ে।

অবশেষে মহান আল্লাহ আমাদের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় তথা সব ছাত্রসমাজকে জাতীয় মুক্তির আবাবিলরূপে কবুল করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত যেন স্বয়ং আল্লাহ পাকের একেকটি পরিকল্পনা। জুলাই আন্দোলনে দেখেছি, দেয়ালে পিঠ ঠেকলে মেয়েরাও কতটা বলিষ্ঠ প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারেন। সে দিনগুলোতে এটিও দেখেছি, শুধু বিবেকের তাড়নায় অনেক মা-বোন সে দিন চরম অসুস্থতা নিয়েও আন্দোলনে শামিল হয়েছেন, স্লোগান দিয়েছেন ও রাজপথ প্রকম্পিত করেছেন। উত্তরবঙ্গের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

দেশের অর্ধেকের বেশি জনশক্তি নারী, তাই নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিপ্লবকে যেমন বেগবান করেছে, তেমনি সফলতার শিখরে পৌঁছতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সবশেষে মহান আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি এ জন্য যে, তিনি দয়া করে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে আমাদের মুক্তির স্বাদ দিয়েছেন।

লেখক : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়