গ্রামে যারা শারীরিক পরিশ্রম করতেন, তাদের মধ্যে বড় বড় রোগ তেমন একটা দেখা যেত না। বিশেষ করে হৃদরোগ, কিডনির জটিলতা, লিভারের সমস্যা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ বেশি দেখা যেত শহরে, বিত্তশালীদের মধ্যে। কিন্তু এখন খেটে খাওয়া মানুষও এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বাড়ছে অকালমৃত্যু। সংক্রামক রোগের চেয়েও বেশি মৃত্যু ঘটছে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে। বলা যায়, অসংক্রামক রোগ এখন নীরব মহামারী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে মোট মৃত্যুর ৭৪ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। বাংলাদেশে এ হার এরই মধ্যে ৭০ থেকে ৭১ শতাংশে এসে ঠেকেছে। বছরে প্রায় পৌনে ছয় লাখ মানুষ এসব রোগে প্রাণ হারাচ্ছেন। এক কোটি ৩১ লাখের বেশি মানুষ আমৃত্যু এসব রোগের ধকল বয়ে বেড়াচ্ছে।

এই বিপর্যয়ের গোড়ায় আছে আমাদের প্রতিদিনের খাবারের তালিকা। আমাদের খাবারে ভেজাল থাকে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, গোশত থেকে শুরু করে শিশুদের গুঁড়া দুধ ও বেকারি পণ্য-প্রতিটি স্তরেই বিষ আছে। খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিক, কৃত্রিম রঙ ও অননুমোদিত প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করছেন ব্যবসায়ীরা। বেশি লাভের আশায় এভাবেই অসাধু ব্যবসায়ীরা খাবারে ভেজাল ও বিষ মিশিয়ে দিচ্ছেন।

ভেজাল ও অনিরাপদ খাবারের বিরুদ্ধে সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ চলছে। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। তার নির্দেশের পর সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বা ঢাকঢোল পিটিয়ে অভিযান চালিয়ে এই মহাসঙ্কট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

‘ভেজাল খাদ্য’ আর ‘অনিরাপদ খাদ্য’ এক বিষয় নয়। দুধে পানি মেশানো বা মোটা চাল ঘষে চিকন করাকে বলা হয় ভেজাল। আর দুধ, চাল, মাছ কিংবা শাকসবজিতে হেভিমেটাল (ভারী ধাতু), কীটনাশক অথবা তেজস্ক্রিয় উপাদানের উপস্থিতি খাবারকে ‘অনিরাপদ’ করে তোলে। মোবাইল কোর্ট দিয়ে দোকানে বাসি-পচা খাবার বিক্রি বন্ধ করা কিংবা জরিমানা করা সম্ভব। কিন্তু খাবারের ভেতরের রাসায়নিক বিষ দূর করা সম্ভব নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দেশের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ আইন ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেকটা নিষ্ক্রিয়।

অতীতের অনেক ভেজালবিরোধী অভিযানই কার্যকর ফল দেয়নি বলে অভিযোগ আছে। এর পেছনের কারণ অসাধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি, আইনগত দুর্বলতা ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাব। এর জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের শক্তিশালী খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলা।

আমরা মনে করি, চিকিৎসা খাতে বাজেটের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধের বাজেটে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্বাধীন ও শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা দরকার। একই সাথে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন, আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করতে খাবারের এই বিষচক্র ভাঙতে হবে। আপসহীন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া জনস্বাস্থ্যের মহাবিপর্যয় কাটানো যাবে না।