পৃথিবী দ্রুতগতিতে বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলছে। প্রকৃতিতে অনিশ্চিত আচরণ বাড়ছে। ঝড়-বাদলের মৌসুমে দেখা যাচ্ছে খরা। শীতের সময়ে পড়ছে গরম। গরমের মৌসুমে পড়ছে শীত। বিচিত্র আবহাওয়ার সাথে মানুষ তাল মেলাতে পারছে না। এর ওপর বাড়ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। মূলত মানুষের উন্নয়নের সীমাহীন লালসা প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব রাখছে। জ্বালানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলছে। তবে যারা এর জন্য বেশি দায়ী তাদের চেয়ে এর ক্ষতিকর প্রভাব বেশি পড়ছে অন্যদের ওপর। মূলত ধনী দেশগুলোর করা অনাচারের শিকার হচ্ছে গরিবরা। তাই কয়েক দশক আগে থেকে সারা বিশ্বে গড়ে উঠেছে পরিবেশ আন্দোলন, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করার একাটি বৈশ্বিক প্রচেষ্টা তারা চালাচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান জাতিসঙ্ঘ জলবায়ু সঙ্কট মোকাবেলায় উদ্যোগ নেয়। শুরু হয় বছর বছর জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন। কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ) নামে এবারের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্রাজিলের বেলেমে। বিরূপ জলবায়ুর শিকার বিশ্ববাসীর প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এর প্রতিবাদ্য হয়েছে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’।
ধনী দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে বিপর্যস্ত হচ্ছে গরিব দেশগুলো। বিশেষ করে সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলো এর প্রধান শিকার। দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর এসব দেশে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। উপকূলীয় জনপদ ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। বাংলাদেশ এ ধরনের সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত একটি দেশ। দেশের দক্ষিণে সমুদ্র তীরবর্তী বড় একটি অংশে নোনা পানি ঢুকে পড়েছে। এতে করে ফসল উৎপাদন ও মাছ চাষ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জনপদের মানুষ সুপেয় পানির সঙ্কটে পড়েছে। আর্সেনিকের প্রকোপ এসব এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এতে করে নতুন নতুন রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। এখানকার পুরনো কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হুমকিতে পড়েছে।
মূলত উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত কারণে এই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দরিদ্র দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে। বেলেমে ১২ দিনব্যাপী সম্মেলনের সাত দিন পেরিয়ে গেলেও অংশগ্রহণকারী দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় আসতে পারছে না। স্বার্থের কারণে দেশগুলো তীব্র বিরোধে জড়িয়েছে। নতুন ভালো কিছু হওয়ার আশা কম, পুরনো যেসব চুক্তি ছিল সেগুলো মানা হবে কি না সেই শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রধান অংশীজন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের এই সম্মেলন থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। নেতৃত্বের আসনে এখন রয়েছে চীন। তারা যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করত সেটি করছে। তবে চীনই এখন বিশ্বের সর্বাধিক কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। দেশটি প্রতিশ্রুত পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমাবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি কমাতে দরিদ্র দেশগুলোর প্রয়োজনীয় সহায়তা দরকার। দরিদ্র দেশগুলোর জন্য তহবিলের দাবিও রয়েছে। বরাবরের মতো এবারো তাদের দাবি উপেক্ষিত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু সম্মেলন উপলক্ষে পরিবেশ কর্মীরা বেলেমে উপস্থিত হয়েছে। পরিবেশবান্ধব টেকসই জ্বালানি ব্যবহারসহ উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়ার দাবি জানাচ্ছে তারা। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ফলপ্রদ হতে পারে কেবল ধনী দেশগুলো যদি উষ্ণতা বৃদ্ধির দায় শিকার করে।