প্রফেসর ড. মো: কামরুজ্জামান
গত প্রায় চার দশক ধরে ইরানের সাথে ইসরাইলের যে ‘ছায়াযুদ্ধ’ চলে আসছিল, সীমা অতিক্রম করে বর্তমানে সেটি সরাসরি ও বহুমুখী প্রলয়ঙ্করী সঙ্ঘাতে রূপ নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। এ হামলায় ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনিসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা শহীদ হন। ইরানও প্রত্যাঘাত শুরু করে। গত এক মাস ধরে ইরান, আমেরিকা ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ চলছে।

এক মাসের যুদ্ধ পর্যালোচনায় নিঃসন্দেহে বলা যায়, হেরে গেছে আমেরিকা ও ইসরাইল। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধনীতি অনুসরণ করেই ইরান তার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান আগে আক্রান্ত হয়। পরে প্রত্যাঘাত শুরু করে। ইসরাইল ও আমেরিকা ইরানের যেসব লক্ষ্য বস্তুতে হামলা চালিয়েছে, ইরান ঠিক তারপরই আমেরিকা ইসরাইলের সেসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইরান একটুও সীমালঙ্ঘন করেনি। এ যুদ্ধে ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হলেও আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধসামগ্রী ফুরিয়ে আসছে। আমেরিকার এক বছরের তৈরি সব মিসাইল এবং ড্রোন গত ২৭ দিনে শেষ করেছে। বিপরীতে ইরানের আরো ছয় মাস যুদ্ধ করে যাওয়ার মতো মিসাইল মজুদ রয়েছে বলে দেশ-বিদেশের মিডিয়া সূত্রে জানা যাচ্ছে। ইরান আমেরিকার মূল্যবান কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান, কয়েকটি রণতরী ও বিশটির অধিক ট্যাংক ধ্বংস করেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত দেশ ইসরাইল। যে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি যে, পৃথিবীর কোনো শক্তিই দেশটিকে হামলা করতে পারবে না। কিন্তু সেই দেশটি আজ ইরানের হামলায় লণ্ডভণ্ড। মোসাদের হেডকোয়ার্টার এবং নেতানেয়াহুর বাড়ি চূর্ণ-বিচূর্ণ। এতে ট্রাম্প পাগল হওয়ার জোগাড়।

ট্রাম্প এখন যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সৌদিকে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু সালমান তাতে রাজি হচ্ছেন না। আরবসহ মধ্যপ্রদেশের দেশগুলো আমেরিকার সেবাদাস। এ কথাটি বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত। তারপরেও ট্রাম্প ক্রাউন প্রিন্স সালমানের দাসত্বে খুশি নয়। সালমানকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হতে নির্দেশ দিয়েছে। সালমান রাজি হননি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পড়েছে উভয় সঙ্কটে। এক দিকে তারা চায়, ইরান দুর্বল হোক এবং এ ক্ষেত্রে আমেরিকা নিজেই খেলুক। কিন্তু ট্রাম্প চায় সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্য এ যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করুক। তবে সৌদি আরব এটিও জানে, ইরান দুর্বল হলে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হবে। ইহুদিরা তখন সৌদিসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য দখল করবে। আবার সৌদি আরব এটিও জানে, এ যুদ্ধে ইরান জিতে গেলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের মিত্রশক্তি আমেরিকার বিদায় ঘণ্টা বেজে যাবে। ইরান হবে মধ্যপ্রাচ্যের মোড়ল। কোনোটিই সৌদি আরব ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো চায় না। ফলে উভয় সঙ্কটে পড়েছে।

তেহরানে ব্যাপক বিমান হামলার পরও ইরানকে দমাতে পারেনি ইসরাইল ও আমেরিকা। বিপরীতে ইরানের হামলা আগের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সব সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে গেছে। সুরক্ষিত ইসরাইল লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালী শুধু বন্ধই করেনি ইরান, সেটির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

ইসরাইল ও আমেরিকা অনুধাবন করেছে, বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো গেলেও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা তেহরানকে সম্পূর্ণরূপে কাবু করা অসম্ভব। তাই পেন্টাগন ও সিআইএ এখন ইরানের অভ্যন্তরীণ জাতিগোষ্ঠীগত ফাটলগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে দেশটিকে ভেতর থেকে অস্থির করার কৌশল নেয়। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার মাধ্যমে ইরানের ভেতরে একটি প্রচ্ছন্ন গৃহযুদ্ধ বা অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করার চেষ্টা করে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানে স্থল অভিযান শুরু করতে চাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। নতুন করে তাদের জর্জ ডব্লিউ বুশ নামের রণতরী ইরানের দিকে ধেয়ে আসছে। যে রণতরিতে রয়েছে প্রায় চার হাজার স্পেশাল কমান্ডো বাহিনী। আমেরিকা ইরানের খার্গ আইল্যান্ডে ১০ হাজার কমান্ডো বাহিনী নামাতে চাইছে। আর ইরানও এ অভিযান মোকাবেলা করতে প্রস্তুত রেখেছে ১০ লাখ সেনা এবং ৪০ বছর ধরে গড়ে তোলা বিশেষ কমান্ডো বাহিনী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরানে স্থলহামলার পরিকল্পনা সমর্থন করছে না। এর পরিণামে বাহিনীর চিফ অব স্টাফসহ বেশ কয়েকজন জেনারেলের চাকরি চলে গেছে।

ক্ষিপ্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেছেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সেতু ধসিয়ে দিয়েছেন। আবার সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে বাহবা নেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এটি যে যুদ্ধাপরাধ সেই ধারণাও তার নেই।

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক কুর্দি বিদ্রোহীদের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত করার চেষ্টা এরই মধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তুরস্ক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। কারণ তুরস্ক এটিকে তাদের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী হুমকি মনে করে। অন্য দিকে ইরানের অভ্যন্তরে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা ও জাতিগত অস্থিরতা সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের অশান্ত বেলুচিস্তান প্রদেশেও সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদকে নতুন করে উসকে দেয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি করছে।

তেহরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে বালুচ যোদ্ধাদের আন্তঃসীমান্ত তৎপরতা ইসলামাবাদকে কঠিন সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেবে, যা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ধূলিস্যাৎ করতে পারে। এই পরিকল্পিত বিদ্রোহ কেবল ইরানকে দুর্বল করবে না; বরং তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে এক বহুমুখী সঙ্ঘাতের আবর্তে টেনে আনবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনের লেলিহান শিখা সমগ্র দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়াকে এক অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত করতে পারে।

এই সর্বাত্মক যুদ্ধে দিনশেষে কোনো পক্ষই বিজয়ী হতে পারবে না; রণক্ষেত্রজুড়ে পড়ে থাকবে কেবল সভ্যতা ও অর্থনীতির বিশাল এক ধ্বংসস্তূপ। সিআইএর ‘কুর্দি কার্ড’ কিংবা তেহরানের প্রতিরক্ষা কৌশল- সবই এই অঞ্চলকে এক অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিকুণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা নেভানোর সক্ষমতা কারো নেই। যুদ্ধ বন্ধে চীন, রাশিয়া, ওমান, তুরস্ক ও কাতার কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কূটনৈতিক তৎপরতা সফল হবে এমন আশা বেশ ক্ষীণই বলা যায়। তবে ফলাফল জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

তবে যাই হোক না কেন, আপাতত দৃষ্টিতে মুসলিম বিশ্বের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে ইরান ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইরান-আমেরিকার চলমান যুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের ইমেজ ফিরিয়ে দিচ্ছে ইরান। কারণ যুদ্ধের এই সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করলে বলা যায়, ইরানের কাছে স্পষ্টতই হেরে যাচ্ছে আমেরিকা। গোটা পৃথিবী এতদিন হুজুরদের কাছ থেকে শুধু গুনাহ মাফের দোয়া শিখেছে। শিখেছে লাখ লাখ বছরের সওয়াব অর্জনের দোয়া। কিন্তু ইরানের মাধ্যমে বিশ্ববাসী এখন দেখতে পাচ্ছে বদর-উহুদের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। মুসলিমরা তৈরি করেছে অত্যাধুনিক মিসাইল, ড্রোন। ঈমান কথায় নয়, কিতাবি জ্ঞানে নয়, লেবাসেও নয়। প্রকৃত ঈমান হলো লোহায় পুড়িয়ে, আগুনে জ্বালিয়ে ও আকাশছোঁয়া শক্তিতে রূপান্তরিত করার এক বিশাল প্রক্রিয়ার নাম। আর এটিই আল কুরআনের বাস্তব নির্দেশ।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া