ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো, যে আদর্শের জন্য মানুষ জীবন দেয়, সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠার পথেই যদি তাদের পরিবার অবহেলার শিকার হয়। তখন প্রশ্ন ওঠে, সংগ্রাম কি কেবল স্লোগানে বেঁচে থাকে, নাকি রাষ্ট্রের আচরণেও তার প্রতিফলন দেখা যায়?

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক শহীদ মায়ের আর্তনাদ সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে। তার অভিযোগ, ‘বৈষম্য রোধে জীবন দিয়েও বৈষম্যের শিকার আমার ছেলে।’ একটি বাক্য, অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের প্রতি গভীর হতাশা।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে প্রাণ হারান ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ওয়াসিম আকরাম ও মোহাম্মদ ওমর ফারুক। তারা এমন এক আন্দোলনের অংশ ছিলেন, যার মূল স্লোগানই ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান; কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত কার্যত এগোয়নি, বিচার শুরু হয়নি। ন্যায়বিচারের এই দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু বিচারপ্রার্থীদের নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আরো বেদনাদায়ক বিষয় হলো, শহীদদের মধ্যেও যেন অদৃশ্য এক বিভাজন তৈরি হচ্ছে। যদি একজন শহীদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়, তাহলে অন্য শহীদদের একই মর্যাদা দেয়া হবে না কেন? একজন মায়ের এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তিগত দাবি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সমতার প্রশ্ন। শহীদের পরিচয় রাজনৈতিক পছন্দ, সামাজিক পরিচিতি বা জন-আলোচনার মাত্রা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি শহীদের রক্তের মূল্য সমান হওয়াই উচিত।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা একটি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই আন্দোলনের শহীদদের পরিবারও সমান মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় সহমর্মিতা পায়। অন্যথায় ‘বৈষম্যবিরোধী’ স্লোগান কেবল একটি রাজনৈতিক শব্দবন্ধ হয়ে পড়ে।

শহীদ জননী কোহিনূর আক্তারের আরেকটি অভিযোগও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসন নিয়মিত খোঁজ নিত। এখন সেই যোগাযোগ নেই বললেই চলে। কোনো অনুষ্ঠান থাকলে একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়। একটি রাষ্ট্র কি তার শহীদ পরিবারের সাথে সম্পর্ককে কেবল ডিজিটাল বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে?

রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে প্রশ্নের মুখে। বিরোধী বা সহযোগী দল কেউ কেউ যোগাযোগ রাখলেও ক্ষমতাসীন দলের দায় স্বাভাবিকভাবেই বেশি। কারণ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব যাদের হাতে, শহীদ পরিবারের প্রতি নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বও তাদেরই বেশি। ক্ষমতায় যাওয়ার পথে যাদের আত্মত্যাগ ছিল ভিত্তি, ক্ষমতায় গিয়ে তাদের পরিবারকে ভুলে যাওয়া রাজনৈতিক কৃতজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে একটি ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যদি সেটিই সত্য হয়, তবে সেই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়ও হতে হবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের। ইতিহাস শুধু স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বিচারিক অগ্রগতি এবং সামাজিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়।

শহীদ মায়ের স্মৃতিচারণ আরো হৃদয়বিদারক। সন্তানের লাশ দেখার আগেই তাকে কাগজে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। পরে জানতে পারেন, তার ছেলের পায়ে নয়, বুকে গুলি লেগেছিল। এই স্মৃতি কোনো মা কোনো দিন ভুলতে পারেন না। তাই তার কাছে বিচার শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি সন্তানের প্রতি শেষ দায়িত্ব পালন।

ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিচারহীনতা মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়। তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে সাক্ষ্যপ্রমাণ দুর্বল হয়, প্রত্যাশা ভেঙে পড়ে এবং মানুষের মনে এই ধারণা জন্মায় যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও বিচারব্যবস্থার গতি বদলায় না।

এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজ। জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত প্রতিটি মামলা নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল নিশ্চিত করতে হবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে অযথা দীর্ঘায়িত হতে দেয়া যাবে না। একই সাথে শহীদ পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা, মনোসামাজিক সহায়তা এবং সমান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি।

একটি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নৈতিক অবস্থান। সেই নৈতিক অবস্থান তখনই অটুট থাকে, যখন তার শহীদদের মধ্যে কোনো ভেদরেখা টানা হয় না। বৈষম্য দূর করার সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের পরিবার যদি নিজেরাই বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে আন্দোলনের চেতনা ক্ষয় হতে শুরু করে।

রাষ্ট্রের কাছে আজ সবচেয়ে বড় পরীক্ষা একটাই— বৈষম্যবিরোধী সংগ্রামের শহীদদের প্রতি সমান সম্মান, দ্রুত বিচার এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা। কারণ বৈষম্য রোধের নামে নতুন বৈষম্য সৃষ্টি হলে ইতিহাস একদিন কঠিন প্রশ্ন করবেই।