মীর লুৎফুল কবীর সা’দী
একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা রক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতার মধ্যে নিহিত। রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত শক্তিশালী হয়ে ওঠে যখন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন যে, আইন তার পাশে দাঁড়াবে এবং ক্ষমতাবান ও দুর্বল উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।

বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের সমতা, প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এই অঙ্গীকারগুলো বাস্তবে রূপ দেয়া পুলিশ বাহিনীর অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ইউনিফর্ম পরিবর্তন জনপরিসরে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে। নতুন রঙ, নতুন নকশা এবং আধুনিক উপস্থাপনা নিঃসন্দেহে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রতীক। বাস্তবতার নিরিখে ইউনিফর্ম পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। উন্নত কাপড়, জলবায়ু-উপযোগী নকশা, সহজ শনাক্তকরণ, পেশাগত পরিচয়ের নবায়ন এবং বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধিতে নতুন ইউনিফর্ম ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বের বহু দেশ সময়ের প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরিবর্তন করে।

কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। নতুন ইউনিফর্ম কি জনগণের তিক্ত অভিজ্ঞতা পরিবর্তন করতে পারে? অবিচল আস্থা সৃষ্টি করতে পারে? নতুন রঙ কি নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি, মানবিক আচরণ কিংবা সকল ক্ষেত্রে আইনের সমানপ্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে?

‘Visible Reform’ এবং ‘Institutional Reform’ এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। প্রথমটি দৃশ্যমান পরিবর্তন আর দ্বিতীয়টি প্রতিষ্ঠান, নীতি, সংস্কৃতি, আচরণ ও জবাবদিহির পরিবর্তন। দৃশ্যমান পরিবর্তন জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু স্থায়ী জনআস্থা সৃষ্টি করে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ইউনিফর্ম পরিবর্তন যদি বৃহত্তর সংস্কার কর্মসূচির অংশ হয় তবে তা ইতিবাচক হতে পারে; কিন্তু যদি সেটিই সংস্কারের প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে তবে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না এটা নিশ্চিত।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’আলা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের ভেতরের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সূরা আর-রা’দ, ১৩:১১) অন্যত্র তিনি নির্দেশ দেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো... কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ না করে। ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৮)

এই আয়াতগুলো ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবার জন্য সংস্কারের মৌলিক দর্শন তুলে ধরে। স্থায়ী পরিবর্তন বাহ্যিক রূপান্তরের মাধ্যমে নয় বরং নৈতিকতা, চিন্তা, চরিত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের নিজস্ব বাহিনী নয়; তারা সংবিধান, আইন এবং জনগণের নিরাপত্তার রক্ষক।

আধুনিক পুলিশিংয়ের জনক স্যার রবার্ট পিল ১৮২৯ সালে যে নীতিমালা প্রবর্তন করেছিলেন, তার অন্যতম মূলনীতি ছিল, ‘The police are the public and the public are the police.’ অর্থাৎ ‘পুলিশই জনগণ, আর জনগণই পুলিশ।’ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনগণের মধ্য থেকেই পুলিশের জন্ম।

পুলিশ জনগণের সম্মতি, আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই কাজ করবে। পুলিশের বৈধতা বলপ্রয়োগ থেকে নয় জনগণের সম্মতি, আস্থা এবং সহযোগিতা থেকে আসে। আজকের বিশ্বে পুলিশিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি হলো ‘Police Legitimacy’ অর্থাৎ জনগণের কাছে পুলিশের নৈতিক ও আইনি গ্রহণযোগ্যতা। একজন নাগরিক যখন বিশ্বাস করেন যে পুলিশ নিরপেক্ষ, ন্যায়পরায়ণ এবং সম্মানজনক আচরণ করবে, তখন আইন মানার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টম আর. টাইলারের Procedural Justice Theory দেখিয়েছে, মানুষ কেবল শাস্তির ভয়ে আইন মানে না। তারা আইন মানে যখন তারা বিশ্বাস করে যে, আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়াটি ন্যায়সঙ্গত, স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণ। এ কারণেই পুলিশের সবচেয়ে বড় সম্পদ জনগণের আস্থা পোশাক, অস্ত্র, যানবাহন বা বিরাট বাজেট নয়।

যখন মানুষ থানায় যেতে ভয় পায়, অভিযোগ করতে দ্বিধা করে, অথবা মনে করে যে পরিচয়, অর্থ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব আইনের চেয়ে বেশি কার্যকর, তখন বোঝা যায় সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা খর্ব করে, অপরাধের বিচার হয় না অথবা ক্ষমতার ভাষা মানবিক আচরণকে ছাপিয়ে যায়। এসব সমস্যার সমাধান কেবল ইউনিফর্ম পরিবর্তন করে সম্ভব নয়।

ইসলাম রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে ছেড়ে দেয়া হতো, আর দুর্বল ব্যক্তি অপরাধ করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করা হতো।’ (সহিহ আল-বুখারী, হাদিস ৩৪৭৫; সহিহ মুসলিম)

এই শিক্ষা আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সুশাসনের ভিত্তির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একই দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের Code of Conduct for Law Enforcement Officials (1979) Ges Basic Principles on the Use of Force and Firearms by Law Enforcement Officials (1990)- আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য মানবাধিকার, প্রয়োজনীয়তা, সামঞ্জস্য, সংযম এবং জবাবদিহিকে মৌলিক নীতি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। একইভাবে জাতিসঙ্ঘের Sustainable Development Goal (SDG) ১৬-তে শান্তি, ন্যায়বিচার এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাকে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে ঘোষণা করেছে। কার্যকর, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

বিশ্বব্যাংকের Worldwide Governance Indicators, OECD-এর শাসনব্যবস্থা বিষয়ক গবেষণা এবং Ges World Justice Project Rule of Law Index ধারাবাহিকভাবে দেখিয়েছে যে, যেখানে আইনের শাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী, সেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। অন্য দিকে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না বরং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা ও নাগরিকের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশ পুলিশকে আরো কার্যকর, আধুনিক ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, সেবাকেন্দ্রিক পুলিশিংয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আইন ব্যক্তি বা দলের পরিচয়ে নয়; কেবল সংবিধান, সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োগ হয়। তৃতীয়ত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চতুর্থত, মানবাধিকার, নৈতিক নেতৃত্ব এবং পেশাগত আচরণকে প্রশিক্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। পঞ্চমত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বাস্তবায়ন করতে হবে। ষষ্ঠত, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যেখানে ফরেনসিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট, বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা, অনলাইন জিডি, ডিজিটাল এভিডেন্স ম্যানেজমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণ, সাইবার অপরাধ দমন সক্ষমতা এবং ভুক্তভোগী সহায়তা ডেস্কের মতো আধুনিক ব্যবস্থা ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করা হবে।

এর ফলে তথ্য-প্রমাণনির্ভর বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি পুলিশ সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে নৈতিকতা, নেতৃত্বের সততা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং সবার প্রতি সমান সেবা প্রদানের আদর্শ।

বাংলাদেশ পুলিশে অসংখ্য দক্ষ, সৎ, পেশাদার ও আত্মত্যাগী সদস্য রয়েছেন, যারা সন্ত্রাস দমনসহ নানা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তারা রাষ্ট্রের গর্ব। একই সাথে এটিও সত্য যে, কিছু সদস্যের অনিয়ম, অপেশাদারসুলভ আচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহার পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে প্রকৃত সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত সৎ কর্মকর্তাদের আরো শক্তিশালী করা, পেশাদারিত্বকে পুরস্কৃত করা এবং অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। নাগরিকরা আজ অনেক বেশি সচেতন, তুলনামূলকভাবে অধিক শিক্ষিত, তথ্যসমৃদ্ধ এবং জবাবদিহিরও প্রত্যাশী। এই বাস্তবতার আলোকেই পুলিশ বাহিনীকে সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থা হবে এমন যেখানে কোনরকম রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, সাংবিধানিক দায়িত্ব হবে পরিচয়ের ভিত্তি। ভয় নয়, আস্থা হবে পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি। অহেতুক ক্ষমতা প্রদর্শন ও অবৈধ উৎকোচ গ্রহণের অসৎ প্রবণতা বন্ধ করে আন্তরিক সেবার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। নতুন ইউনিফর্ম নয়, নতুন কর্মসংস্কৃতিই ইতিহাস রচনা করে। ইউনিফর্ম সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সব রাষ্ট্রের পুলিশ জনগণের আস্থা অর্জন করেছে তারা কেবল অপরাধ দমনে নয় বরং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও ফলপ্রসূভাবে এগোতে পেরেছে।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক