ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে- কোনো একক বিদেশী রাষ্ট্র বা পরাশক্তির রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক চাল কিংবা সামরিক সহায়তার ওপর ভর করে কোনো স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হতে পারে না। তবে সম্প্রতি ভারতীয় লোকসভায় ভারতের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং নতুন রাষ্ট্র গঠন নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা ইতিহাস বিকৃতি। বাংলাদেশের কোটি মানুষের অসীম আত্মত্যাগ, অদম্য বীরত্ব ও সার্বভৌম লড়াইকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করার শামিল
লোকসভায় মোদি সরকারের সাম্প্রতিক সামরিক ও বৈদেশিক নীতির তীব্র সমালোচনা করতে গিয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী দাবি করে বসেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠন করার পুরো সাফল্যই মূলত ভারতের এবং তা অর্জন হয়েছিল তার দাদী তথা তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের মতো বিশ্ব পরাশক্তির কঠোর প্রশাসনিক চাপ এবং জটিল আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সঙ্কট অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করে ইন্দিরা গান্ধীই নাকি পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন। তার এই বক্তব্যের পর ভারতীয় পার্লামেন্টে উপস্থিত কংগ্রেস সদস্যদের করতালির জোয়ার ওঠে। সেটি প্রমাণ করে, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সাধারণ হাতিয়ার ও নিজেদের সাফল্য হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে কতটা গভীর।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এই বিতর্কিত বয়ানে আরো বলা হয়, একাত্তরে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ মূলত ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিজয়ের প্রতীক, যার জন্য তিনি কখনোই একক কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা করেননি; কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির মধ্যে বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলন এবং লাখ লাখ শহীদের রক্তক্ষয়ী অবদানকে এক কলমের আঁচড়ে সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে দেয়া দায়িত্বশীল ও পরিপক্ব রাজনৈতিক আচরণ হতে পারে না। প্রিয়াঙ্কার এই বক্তব্য কার্যত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে রক্তক্ষয়ী গণসংগ্রাম থেকে নামিয়ে এনে দিল্লির একতরফা ‘ভূরাজনৈতিক চাল’ বা ‘সামরিক প্রজেক্ট’ হিসেবে প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা। তবে বাস্তব সত্য হলো, ভারতের তৎকালীন রাজনৈতিক, সামরিক ও মানবিক সহযোগিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে নিঃসন্দেহে ত্বরান্বিত করেছিল; কিন্তু সেই সহযোগিতাই স্বাধীনতার একমাত্র মূল চালিকাশক্তি ছিল না। যুদ্ধের মূল প্রেরণা ছিল এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ মেহনতি মানুষ, যারা বুক পেতে দিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বুলেটের সামনে।
ইতিহাসের গভীর ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে ভারতীয় নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজের একাংশ সবসময় একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত চশমা দিয়ে দেখার চেষ্টা করে এসেছে। বিজয়ের পরপরই তৎকালীন ভারতীয় নেতৃত্বের একাংশ দুই পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হওয়াকে দীর্ঘ ৬০০ বছরের ইতিহাস এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের এক ধরনের ঐতিহাসিক বা কৌশলগত প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই পুরনো এবং সঙ্কীর্ণ বয়ানেরই নতুন ও নগ্ন প্রতিফলন ঘটেছে। গত সাড়ে পাঁচ দশক ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিশেষ সুবিধাবাদী বয়ান প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে- যেখানে বারবার দেখানো হয়, কেবল ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কৌশলগত সহায়তায় এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল। এই একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি দেশীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগকে খর্ব করে, যারা সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ পাননি কিংবা দেশের অভ্যন্তরে অবরুদ্ধ থেকে দখলদার ও অত্যাচারী বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এই বিতর্কিত মন্তব্যের পেছনে ভারতের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যকার তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যের লড়াই বড় ভূমিকা পালন করেছে। সম্প্রতি নতুন দিল্লিতে শিক্ষা খাতের চরম অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতনের প্রতিবাদে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, অখিলেশ যাদবসহ বিরোধীরা সাত লোক কল্যাণ মার্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধরনায় বসেন। পরে সেখান থেকে তাদের নিরাপত্তাবাহিনীর মাধ্যমে আটক করা হয়। একই সময় সংসদে মোদি সরকারের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্র ও সামরিক পলিসির কৌশলগত ব্যর্থতা তুলে ধরতে গিয়ে প্রিয়াঙ্কা মূলত ইন্দিরার শাসনামলের তথাকথিত ‘কূটনৈতিক বীরত্ব’ ও সাফল্যকে টেনে সামনে আনেন। অর্থাৎ, ভারতে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার, রাজপথের আন্দোলন জোরদার ও নরেন্দ্র মোদিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়ার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইতিহাসকে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহার করতে গিয়ে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে কংগ্রেস।
তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে কেবল ভারত একা নয়, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নও দিল্লির পক্ষে রাজনৈতিক ও ভেটো ক্ষমতার কূটনীতি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তৎকালীন দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অক্ষের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ভারত তাদের নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষা, পূর্ব সীমান্তে দীর্ঘদিনের বৈরী পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি নিষ্ক্রিয় করা এবং কোটি কোটি শরণার্থীর অর্থনৈতিক চাপ থেকে বাঁচার তাগিদেই মূলত যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়েছিল। এটি ছিল ভারতের নিজস্ব জাতীয় ও নিরাপত্তা স্বার্থের অপরিহার্য তাগিদ, কোনো একক ব্যক্তির নিছক পরোপকার বা উদার রাজনৈতিক উপহার নয়। তা ছাড়া ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকারের সর্বাত্মক সহায়তার মূল শক্তি জোগাচ্ছিল বাংলাদেশের প্রবাসী মুজিবনগর সরকার এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অবিরাম গেরিলা আক্রমণ। মাঠপর্যায়ে সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধারা যদি পাক বাহিনীর শক্ত ঘাঁটিগুলোকে তছনছ না করত, তবে মিত্রবাহিনীর পক্ষে এত দ্রুত এবং সহজে সামরিক সাফল্য অর্জন করা কখনোই সম্ভব হতো না।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জাতীয় ইতিহাস চর্চার জন্য বিরাট সতর্কবার্তা ও নতুন শিক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সঠিকভাবে তুলে ধরতে হলে ইতিহাসকে কেবল ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের গণ্ডিতে আটকে রাখলে চলবে না। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের শিকড় ছড়িয়ে আছে শত বছরের লড়াইয়ের ভেতরে। স্বাধীন সুলতানি আমল থেকে শুরু করে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, হাজী শরীয়তুল্লাহর ঐতিহাসিক ফরায়েজী আন্দোলন, মজনু শাহর ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে পলাশীর প্রান্তরে নবাবের আত্মত্যাগ, নীলকরদের নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে প্রজা বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের প্রথম সিপাহি বিপ্লব এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পথ ধরে এই অঞ্চলে বসবাসকারী জনমানুষের স্বাধিকার চেতনার বিকাশ ঘটেছিল। পরে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ১৯৬৯ সালের অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় এ দেশের মানুষ ১৯৭১ সালে নিজ হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
এই সত্যকে আড়াল করার বা নিজেদের ঝুলিতে পুরে নেয়ার যেকোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা কূটনৈতিক প্রয়াসকে ইতিহাস কখনোই মেনে নেবে না। বাংলাদেশও সেটি নীরবে মেনে নিতে পারে না।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com