রমজান কারো কাছে বাড়তি মুনাফা হাতানোর মৌসুম। চক্রবিশেষের কাছে বাকি ১১ মাসের চেয়ে এই মাসটি বেশি লোভনীয়। এরা অপেক্ষাই করে মৌসুমটি ধরার। সফলও হয়। সরকারের দিক থেকে বরাবরের মতো এদের রোখার ব্যাপক চেষ্টা। হুমকি-ধমকি অবিরাম। বাস্তবটা কঠিন। সরকারের কাজ সরকার করে, এদের ধান্ধা এরা সারে। এটাই বরাবরের চিত্র। চাল, ডাল, চিনি, তেল, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে ইফতারের প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বৃদ্ধি এখানে সাধারণ মানুষকে চরম আর্থিক চাপে ফেলে। কিন্তু, এবারের প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। মানুষের প্রত্যাশাও বেশি।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে, ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা বলে আগাম মূল্য সমন্বয় করেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই চাপ কিছুটা কমে। বিশেষ করে গত বছরের রমজানে অতি জরুরি কয়েকটি পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসায় স্বস্তি ফিরেছিল বাজারে। এবার সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রমজানের আগ মুহূর্তে বাজার আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচনী ছুটির প্রভাবে সরবরাহ কিছুটা কম ছিল। যদিও এই সময়ে চাহিদা বেড়েছে। তাদের দাবি, এ ঘাটতির সুযোগে পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রমজানকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। সরবরাহে বড় ধরনের কোনো সঙ্কট নেই। তাই অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ার সুযোগ নেই। তবে বাজারে ঘুরপাক খাচ্ছে আরেকটি প্রশ্ন। সরবরাহ ঘাটতির আড়ালে কোনো অসাধু চক্র বা সিন্ডিকেট কি দাম নিয়ন্ত্রণ করছে? বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে সন্দেহ বাড়ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রেই ২৫ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত মজুদ রয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যমান চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত পণ্য দেশে রয়েছে। বাস্তবের সাথে তা মিলছে না। পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে বাজারে এভাবে দাম চড়ার হেতু কি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক ২৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। এর ৮০ ভাগ স্থানীয় উৎপাদন থেকে মেটানো সম্ভব হয়। ২০ ভাগ ঘাটতি পূরণের জন্য নির্ভর করতে হয় আমদানির ওপর যার বেশির ভাগ আসে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। অপর দিকে, দেশের মোট চাহিদার ৯৫ শতাংশ ভোজ্যতেল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিশ্বের শীর্ষ সয়াবিন তেল উৎপাদনকারী দেশ হলো চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণ ডলারের বিপরীতে দেশগুলোর মুদ্রা শক্তিশালী হয়েছে। এ ছাড়া তারা রফতানি শুল্ক বাড়িয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে আমদানির ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আর তাই স্থানীয় বাজারে বেড়েছে দাম।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক বছর যাবতই তেলের বাজার অস্থিতিশীল। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৮২.৫ মার্কিন ডলার। ফলে আমদানিনির্ভর দ্রব্যের পরিবহন খরচ বেড়েছে। রমজান ঘিরে আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের বাজারে প্রতি বছরই বাড়তি চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, এঙ্কর ডাল, পেঁয়াজ, আটা ও খেজুরের চাহিদা এ সময় বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এবারও আগের ইতিহাসের কিছুটা পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। শুধু রমজান মাসেই সয়াবিন তেলের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টন। একই সময়ে চিনির চাহিদাও ৩ লাখ টন। ছোলার চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টনের মধ্যে। মসুর ডালের প্রয়োজন ২ লাখ ৫ হাজার টন। পেঁয়াজের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ টন। আর খেজুরের চাহিদা ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন পর্যন্ত পৌঁছায়। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, প্রত্যেকটি পণ্যেরই চাহিদার তুলনায় মজুদ কম আছে। ফলে সিন্ডিকেট চক্র দাম নিজেদের মতো বাড়িয়ে ভোক্তাদের পকেট কাটছে।

এবার রমজানের ঠিক এক দিন আগে শুরু হয়েছে নতুন সরকারের কার্যক্রম। সরকার সর্বোচ্চ অ্যাটেনশন দিয়েছে নিত্যপণ্যের বাজারের দিকে। আবার রমজানে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখার অঙ্গীকারও করেছে সরকার। সেই দৃষ্টে চেষ্টাও করছে। বিক্রেতা, পাইকার, উৎপাদক, আড়তদারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সাথে দেনদরবার করেছে, করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা, ডলার সঙ্কট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি— এসব বাস্তবতা থাকলেও রমজান এলেই হঠাৎ করে যে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অসাধু ব্যবসায়ী, মজুদদার ও সিন্ডিকেট চক্রের কারসাজিই বড় কারণ তা বোঝা যায়। চাহিদা বাড়ার আগেই তারা কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে, গুদামে পণ্য আটকে রাখা কিংবা পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে অযৌক্তিক মুনাফা যোগ করা— এসব প্রবণতা বহু দিনের। মানুষও অভ্যস্ত। রমজানে একটু বেশি দামে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য কিনতে হবে— মানসিক এ প্রস্তুতি মানুষ নিয়েই রাখে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন একটি সরকার আমলে মানুষ এর কিছুটা ব্যতিক্রম আশা করে। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি সামাজিক স্থিতি, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এবং মানুষের জীবনমানের সাথে গভীরভাবে জড়িত। গেল বছরটিতে এ সময় ছিল অনির্বাচিত, অন্তর্বর্তী সরকার। গত রমজানে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের দাম কিছুটা স্বাভাবিক ছিল। এবার দ্বিমুখী চিত্র। এক বছরের ব্যবধানে কিছু পণ্যের দাম কমেছে। আবার বেশ কয়েকটির ক্ষেত্রে বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখতে সরকার কঠোর বাজার তদারকি, অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সিন্ডিকেট করে কেউ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ালে ছাড় দেয়া হবে না। সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্টরা এতে ভয় পেয়েছেন কি-না, সেই তথ্য এখনো অস্পষ্ট। রমজানকে উপলক্ষ করে সবজি বাজারে দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা নতুন নয়। বিশেষ করে বেগুন, লেবু ও কাঁচামরিচ, ইফতার টেবিলের অপরিহার্য এই তিন পণ্যে প্রায় প্রতি বছরই বড় পরিবর্তন দেখা যায়। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গোল কালো বেগুন বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ টাকায়। গত বছর রমজান শুরুর একদিন আগে একই বেগুনের দাম ছিল ৭০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা। কালো লম্বা বেগুন ও সাদা গোল বেগুনের দামও ঊর্ধ্বমুখী। গত বছর ৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও এবার তা ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দাম আরো বেশি বেড়েছে। গত বছর রমজানের শুরুতে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। বর্তমানে রাজধানীর বাজারে তা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুন, পেঁয়াজ, আলু নয়— এবার বিশেষ করে লেবু নিয়ে এবার কাণ্ডকীর্তি বেশি। এবার রোজার আগেই রাজধানীর কাঁচাবাজারে লেবু বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। বাজারভেদে প্রতি হালি লেবুর দাম ৭০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে, যা ছোট সাইজ থেকে বড় জাম্বুরা সাইজের লেবু পর্যন্ত প্রযোজ্য। এর ফলে প্রতি পিস লেবুর দাম প্রায় ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত পড়ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, এখন লেবুর সিজন না হওয়ায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বেশি। এ ছাড়া কিছু বাগান মালিক রমজান শুরু হওয়ার আগে গাছ থেকে লেবু না পাড়ায় বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের প্রভাবে বাজার ব্যবস্থায় যে ব্যত্যয় তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত ঠিক করা জরুরি। ফাঁক-গলদও ধরতে হবে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় অসামঞ্জস্য নেই।

কয়েকটা উৎপাদনস্থল, কারখানা ও গুদাম থেকে রোজার পণ্য সরবরাহে বিশেষ নজর দিলে সুফল মিলবে। সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা এবং বাজার মনিটরিং জোরদার দিলে সুফল আসতে বাধ্য। বাংলাদেশের বাজার সংশ্লিষ্টরা কোনো নিয়ম মানতে চান না। লাভ তোলাই তাদের প্রধান কাজ। সাধারণত কোনো দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় যখন এর চাহিদার অনুপাতে জোগান সীমিত থাকে। এ ছাড়া যেসব দ্রব্য আমদানিনির্ভর, সেগুলোর মূল্য বৃদ্ধির সাথে সম্পর্ক থাকে রফতানিকারক দেশে দ্রব্যটির চাহিদা ও জোগান, বাহ্যিক কোনো কারণে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর।

রমজান মাসে বাজারমূল্য অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। সব পেশা-শ্রেণীর মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। টিসিবিকে শহর নগর গ্রামে আরো জোরদার করতে হবে। ব্যবসায়ীদের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের কথা মাথায় রেখে ভেজালমুক্ত দ্রব্য সরবরাহ, অধিক মূল্য উপার্জন থেকে হাত গুটিয়ে নিতে হবে। দুনিয়ার সব দেশে রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাস হলেও, বাংলাদেশের ব্যবসায় এর বিপরীত অবস্থা সর্বত্র বিরাজমান! নতুন সরকারকে দেশের খেটে খাওয়া মানুষের কথা মাথায় রেখে সব ধরনের নিত্যপণ্য সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।

এখানে সরকারের করার কিছু থাকে না— এ ধরনের কথা মানুষ আর শুনতে চায় না। জনবান্ধব দৃষ্টিতে চাইলে এখানেও সরকারের করার অনেক কিছু আছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকেই। সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় সরকারের নজরদারি জোরদার করতে হবেই। কৃষক বা মাঠ পর্যায় থেকে বাজার পর্যন্ত আসার যাত্রায় মাঝপথে যে হাতগুলো কাজ করে সে দিকে নজরদারি থাকলেও বড় রকমের সুফল মিলবে। তা না হলে, নতুন সরকারের ঘোষণা, ‘শাসক নয়, সেবক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার’ শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে!

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

rintu108@gmail.com