ড. শাহরিয়ার হোসেন
সকাল বেলার একটি সাধারণ দৃশ্য কল্পনা করুন। গ্রামের একটি রান্নাঘর, মাটির চুলায় আগুন জ্বলছে, ধোঁয়া ধীরে ধীরে ঘর ভরছে। পাশে বসে আছে একটি শিশু, মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে। শহরের আরেকটি ফ্ল্যাটে, জানালা বন্ধ, বাইরের ধুলো ও শব্দ ঠেকাতে। রান্না হচ্ছে গ্যাসে; কিন্তু বাতাস ভারী, যেন কোথাও আটকে আছে। আমরা সাধারণত এসব দৃশ্যকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিই। কিন্তু এই ‘স্বাভাবিকতা’ই আসলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য সঙ্কটের আচ্ছাদন- ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণ।
বাংলাদেশে বায়ুদূষণ নিয়ে আমরা যেসব কথা বলি, তা সাধারণত বাইরের পরিবেশ ঘিরে। আমরা কল্পনা করি যানজটে ভরা রাস্তা, শহরের প্রান্তে ইটভাটা, আর ঢাকার আকাশ ঢেকে রাখা শীতের ধূসর কুয়াশা। কিন্তু একটি সাধারণ ঘরের ভেতরে- শহর হোক বা গ্রাম, পা রাখলেই এই চিত্র হঠাৎ বদলে যায়। ভেতরের বাতাস অনেক সময় বাইরের চেয়েও খারাপ, কখনো কখনো আরো ভয়াবহ। বাংলাদেশে ইনডোর বা ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণ কোনো প্রান্তিক সমস্যা নয়। এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সঙ্কট, যা প্রতি বছর ৯০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটায়। এটি দেশে অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রে বাইরের বায়ুদূষণের চেয়েও বেশি প্রাণঘাতী। অথচ নীতিনির্ধারণ, বাজেট বরাদ্দ বা জনসচেতনতায় এ বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত। এ সঙ্কটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারী ও শিশু। কারণ তারা সবচেয়ে বেশি সময় কাটায় সেই পরিবেশে, যেখানে দূষণ সবচেয়ে বেশি; অর্থাৎ এটি কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন।
বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা : ঘরের বাতাস কেন বিপজ্জনক
ঘরের ভেতরের বাতাস নিয়ে গবেষণাগুলো একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আনে। অনেক সময় এটি বাইরের বাতাসের চেয়েও বেশি দূষিত। বাংলাদেশজুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইনডোর বায়ুদূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যায়, কখনো পাঁচগুণ পর্যন্ত।
কেন এমন হয়? কারণ ঘরের ভেতরে দূষণের উৎস সীমিত জায়গায় জমা হয় এবং বের হওয়ার সুযোগ কম থাকে। সূক্ষ্ম কণিকা (চগ২.৫), যা ফুসফুসের গভীরে গিয়ে রক্তে মিশে যায়, সবচেয়ে বড় হুমকি। এটি দীর্ঘ মেয়াদে হৃদরোগ, স্ট্রোক, এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশে এই দূষণের প্রধান উৎস রান্নার জ্বালানি। দেশের ৭৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ এখনো কাঠ, গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করে। এসব জ্বালানি সম্পূর্ণভাবে পোড়ে না, ফলে প্রচুর ধোঁয়া ও ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হয়। রান্নার সময় এই দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়, কখনো তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে, যা স্বল্প সময়ের জন্যও বিপজ্জনক। গবেষণায় দেখা গেছে, রান্নার সময় ইনডোর দূষণের মাত্রা ৪০০ এর বেশি হতে পারে, যা ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’। এর সাথে যোগ হয় কার্বন মনোক্সাইড- একটি গন্ধহীন, বর্ণহীন গ্যাস, যা ধীরে ধীরে শরীরের অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এটি তৎক্ষণাৎ বোঝা যায় না; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক ক্ষতি করে।
গ্রামীণ বাস্তবতা : ধোঁয়ার সাথে বসবাস
গ্রামের রান্নাঘর কেবল খাবার তৈরির জায়গা নয়, এটি অনেক সময় একটি স্বাস্থ্যঝুঁকির কেন্দ্র। অনেক পরিবারে রান্নাঘর আলাদা হলেও, তা বন্ধ বা আধা-বন্ধ থাকে। চিমনি নেই, জানালা ছোট, বায়ু চলাচল সীমিত। ফলে চুলার ধোঁয়া বের হতে পারে না, ঘরের ভেতরেই ঘুরপাক খায়। এ পরিস্থিতিতে নারীরা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটান। এটি এক দিনের সমস্যা নয়; বছরের পর বছর চলতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ নারীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাসের হার বেশি। এর সাথে হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই দূষণ শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলে- কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়। শিশুরা এই পরিবেশে বড় হয়। তারা রান্নার সময় মায়ের পাশে থাকে, খেলে, ঘুমায়- সব কিছুই সেই একই বাতাসে। ফলে তাদের শ্বাসতন্ত্র শুরু থেকেই ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
শহরের ভ্রান্ত নিরাপত্তা : সমস্যা বদলায়, ঝুঁকি থাকে
শহরে অনেকেই মনে করেন তারা নিরাপদ, কারণ তারা এলপিজি ব্যবহার করেন। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। শহরের ঘরগুলো ছোট, ঘনবসতিপূর্ণ এবং প্রায়ই পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকে না। ধুলা, শব্দ ও তাপ থেকে বাঁচতে জানালা বন্ধ রাখার সংস্কৃতি- ঘরের ভেতরের বাতাস আটকে রাখে। এর সাথে যোগ হয় বাইরের দূষণ। ঢাকায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ ইনডোর দূষণ বাইরে থেকে আসে। রাস্তার ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, ইটভাটা ও শিল্পকারখানার নির্গমন- সব কিছুই ঘরের ভেতরে ঢোকে। একবার ঢুকে গেলে তা সহজে বের হয় না। ফলে শহরের বাসিন্দারা একটি ‘ডাবল এক্সপোজার’-এর মধ্যে থাকে, ভেতরের ও বাইরের দূষণ একসাথে।
লিঙ্গভিত্তিক বাস্তবতা : অদৃশ্য শ্রম, দৃশ্যমান ঝুঁকি
ইনডোর বায়ুদূষণ বুঝতে হলে আমাদের লিঙ্গভিত্তিক বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। নারীরা পরিবারের ভেতরে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান এবং রান্নার দায়িত্ব তাদের ওপর। ফলে তারা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকেন। এটি কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়- একটি নীরব বৈষম্য। কারণ এ কাজের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, সুরক্ষা নেই, কোনো স্বাস্থ্যসুবিধা নেই। এর অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট। অসুস্থতা কাজের সক্ষমতা কমায়, আয় কমায়, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ায়। ফলে এটি পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।
শিশু : ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব
শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের শরীর এখনো বিকাশমান। তারা দ্রুত শ্বাস নেয়, ফলে বেশি দূষণ গ্রহণ করে। এই দূষণ তাদের ফুসফুসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ইনডোর দূষণের কারণে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের হার বেশি। এর প্রভাব তাদের শিক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের জীবনমানের ওপর পড়ে।
মৃত্যু ও আয়ুষ্কাল- ধীরে ধীরে ক্ষয় : ইনডোর বায়ুদূষণ এমন একটি সমস্যা, যা এক দিনে মানুষকে হত্যা করে না; বরং ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এ কারণে অকালমৃত্যুর শিকার হন। স্ট্রোক, হৃদরোগ, সিওপিডি, ফুসফুসের ক্যান্সার- এসব রোগের পেছনে ইনডোর দূষণ বড় ভূমিকা রাখে। এর প্রভাব আয়ুষ্কালেও পড়ে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকার ফলে মানুষের গড় আয়ু কমে যায়।
অগ্রগতি কেন ধীর : সমস্যা জানা থাকার পরও সমাধানের গতি অত্যন্তÍ ধীর। প্রথমত, মানুষ ঝুঁকি বুঝতে পারে না। মনে করা হয় ধোঁয়া স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির খরচ অনেকের নাগালের বাইরে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত এবং সঠিকভাবে প্রয়োগ হয় না।
বাস্তবসম্মত সমাধান : সমাধান আছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো নতুন কিছু নয়। বহু দেশে পরীক্ষিত, বাংলাদেশেও আংশিকভাবে প্রয়োগ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে রয়ে গেছে; জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়নি। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এগুলো মানুষের জীবনের অংশ করতে পারছি?
১. পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর : ধোঁয়া থেকে মুক্তির প্রথম ধাপ
একটি গ্রামীণ পরিবারের কথা ভাবুন, যেখানে প্রতিদিন রান্নার জন্য কাঠ বা গোবর জ্বালানো হয়। ধোঁয়া শুধু রান্নাঘর ভরে না, পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। যদি সেই একই পরিবার এলপিজি বা বায়োগ্যাস ব্যবহার শুরু করে, পরিবর্তনটা শুধু রান্নার পদ্ধতিতে হয় না, পরিবর্তন আসে পুরো জীবনযাত্রায়। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি যেমন- এলপিজি, বায়োগ্যাস বা অন্যান্য বিকল্প শক্তি ব্যবহারে ধোঁয়া প্রায় শূন্যে নেমে আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, এতে সূক্ষ্ম কণিকা ও কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশেষ করে বায়োগ্যাস বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। গ্রামীণ এলাকায় গবাদিপশুর বর্জ্য, জৈব বর্জ্য সহজেই পাওয়া যায়, যা দিয়ে স্থানীয়ভাবে জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব। এটি শুধু দূষণ কমায় না; বরং একটি টেকসই শক্তি ব্যবস্থাও গড়ে তোলে। তবে এখানে মূল বাধা হলো খরচ ও প্রাপ্যতা। তাই সরকারকে ভর্তুকি, সহজ ঋণ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে- নইলে এই রূপান্তর কাগজেই থেকে যাবে।
২. উন্নত চুলা : বাস্তবতার সাথে সমন্বিত সমাধান
সব পরিবার এক দিনে এলপিজি বা বায়োগ্যাসে চলে যেতে পারবে এমনটি বাস্তবসম্মত নয়। এখানেই উন্নত চুলা বা ইম্প্রুভড কুকস্টোভ (আইসিএস) গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী সমাধান। এসব চুলা এমনভাবে তৈরি, যাতে জ্বালানি আরো দক্ষভাবে পোড়ে এবং ধোঁয়া কম হয়। অনেক ক্ষেত্রে চিমনি বা নির্দিষ্ট বায়ুপ্রবাহ ব্যবস্থাও যুক্ত থাকে, যা ধোঁয়া ঘরের বাইরে বের করে দেয়। বাংলাদেশে আইসিএস কর্মসূচি বহু বছর ধরে চলছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু চুলা বিতরণ করলেই হবে না; মানুষকে এ চুলা ব্যবহারের উপকারিতা বোঝাতে হবে। এটি কেন, কিভাবে ব্যবহার করবে এবং কিভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করবে। যেখানে সঠিকভাবে ব্যবহার হয়েছে, সেখানে দূষণ কমেছে; কিন্তু যেখানে এটি শুধুই প্রকল্প হিসেবে এসেছে, সেখানে তা টেকেনি।
৩. বায়ু চলাচল বৃদ্ধি : সবচেয়ে সহজ
অনেক সময় সমাধান জটিল নয়, আমরা সেটিকে জটিল করে তুলি। একটি ছোট জানালা, একটি চিমনি অথবা দুই দিক খোলা রাখার মতো সাধারণ ব্যবস্থা- এগুলোই ঘরের ভেতরের দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে গ্রামে অনেক রান্নাঘর তৈরি হয় আলো-বাতাসের কথা না ভেবেই। শহরে আবার নিরাপত্তা, ধুলা ও শব্দের কারণে জানালা বন্ধ রাখা হয়। যদি আমরা গৃহনির্মাণ নীতিতে বায়ুচলাচলের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করি, বিশেষ করে রান্নাঘরের ক্ষেত্রে- তাহলে খুব কম খরচেই বড় পরিবর্তন সম্ভব।
৪. আচরণগত পরিবর্তন : ছোট অভ্যাস, বড় প্রভাব
সব সমাধান প্রযুক্তিনির্ভর নয়। অনেক কিছু নির্ভর করে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের ওপর। যেমন- রান্নার সময় শিশুদের দূরে রাখা, ভেজা জ্বালানি ব্যবহার না করা, নিয়মিত ঘর পরিষ্কার রাখা, রান্নার সময় দরজা-জানালা খোলা রাখা। এসব ছোট পদক্ষেপ তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলো একসাথে বড় পার্থক্য গড়ে তোলে। সমস্যা হলো, এসব বিষয়ে সচেতনতা খুব কম। মানুষ জানেই না যে তাদের প্রতিদিনের অভ্যাসই তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে বা কমাচ্ছে। এখানে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. বাইরের দূষণ কমানো : ভেতরের সমাধানের বাইরের শর্ত
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। ঘরের ভেতরের দূষণের একটি বড় অংশ বাইরে থেকে আসে। ঢাকার মতো শহরে প্রায় ৪০ শতাংশ ইনডোর দূষণ বাইরের বাতাস থেকে ঢুকে পড়ে। তাই বাইরে যদি দূষণ কমানো না যায়, তাহলে ঘরের ভেতরের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এর অর্থ হলো পরিবহন খাতের সংস্কার, শিল্প নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটা ব্যবস্থাপনা- এসবই ইনডোর এয়ার কোয়ালিটির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত; অর্থাৎ এটি আলাদা কোনো সমস্যা নয়; একটি পরস্পর-সংযুক্ত সঙ্কট।
নীতিগত অন্ধত্ব : আর উপেক্ষা নয়
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এ সঙ্কটটি এখনো নীতিগত অগ্রাধিকার পায়নি। আমরা জানি সমস্যা কোথায়, সমাধান কী- তবুও এটি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসে না। কারণ এটি দৃশ্যমান নয়, ধীরে ধীরে ক্ষতি করে, তাই তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে না। কিন্তু এই নীরবতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। বাংলাদেশ অতীতে দেখিয়েছে, চাইলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধকরণ, টিকাদান কর্মসূচি- এসবই প্রমাণ করে যে সঠিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব। ইনডোর বায়ুদূষণের বিষয়েও সেই একই গুরুত্ব দিতে হবে। এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার বিষয় নয়। জ্বালানি, পরিবেশ, গৃহনির্মাণ, নারী ও শিশু উন্নয়ন- সব খাতের যৌথ ইস্যু। যদি আমরা এখনো বিষয়টি উপেক্ষা করি, তাহলে জেনেশুনে একটি প্রজন্মকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া হবে। আর যদি এটিকে অগ্রাধিকার দিই- তাহলে আমরা শুধু দূষণ কমাব না, আমরা একটি সুস্থ, মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করব।
শেষ কথা : ঘরের ভেতরের বাতাস আমাদের নিরাপত্তার প্রতীক হওয়া উচিত। কিন্তু সেটিই যদি ধীরে ধীরে আমাদের হত্যা করে, তাহলে সেটি আর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সঙ্কট। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনো এটিকে অদৃশ্যই রাখতে চাই, নাকি দৃশ্যমান করে সমাধানের পথে হাঁটব?
লেখক : পরিবেশবিজ্ঞানী