দেশে কওমি, ইংরেজি মাধ্যম, আলিয়া ও কারিগরিসহ ১৭ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান। এগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন অবস্থা চরম বৈষম্য তৈরি করছে। রাজধানীর ধানমন্ডিতে গত বৃহস্পতিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি কার্যালয়ে ‘শিক্ষায় নিষ্ক্রিয়তার মূল্য : সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতি’ শীর্ষক আলোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
নায়েম-ইউনেস্কো যৌথভাবে প্রকাশিত ‘শিক্ষায় নিষ্ক্রিয়তার মূল্য’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৪৯ শতাংশ ছেলে এবং ৩৩ শতাংশ মেয়ে এখনো শিক্ষার বাইরে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে বা বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে ২১ শতাংশ গণিতে এবং বিজ্ঞানে মৌলিক দক্ষতার স্তরে পৌঁছায় না। মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থতা শুধু একজন শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে না, এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজ ও অর্থনীতির ওপর। শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও দক্ষতা অর্জন না করায় দেশের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়, যার প্রভাব জিডিপিতেও পড়ে। শিক্ষার্থীদের এ না শেখায় ২০৩০ সালে ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমাজ-অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৭ শতাংশের সমান। এ ক্ষতি কেবল আর্থিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়ানোর মতো সামাজিক ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে।
বাস্তবে বাংলাদেশে শিক্ষার মান ও প্রবেশাধিকার উভয় দিক থেকে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ ও মাধ্যমিকে ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট-২০২২ অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশ বাংলা সঠিকভাবে পড়তে পারে না। গণিতে প্রত্যাশিত মান অর্জন করে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী।
বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো একটি শক্তিশালী, মানসম্মত, সময়োপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রতিটি স্তরে রয়েছে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যার সমাধান না হলে দেশীয় মানবসম্পদ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। তাই আগামীতে নির্বাচিত সরকারের নীতি প্রণয়নে শিক্ষা ক্ষেত্রে সংস্কার ও পুনর্গঠনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। কারণ, বিগত ১৬ বছরে কিভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে, তা এখন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবেন তারা শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে পদক্ষেপ নেবে, এটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সবার প্রত্যাশা। তবে সংস্কারের ক্ষেত্রে একথা মনে রাখতে হবে, এটি গতানুগতিক হলে হবে না। হতে হবে আমূল পরির্তনকারী। এই পুনর্মূল্যায়নের মূল ভিত্তি হতে হবে আগামীর কর্মক্ষেত্রে কী জাতীয় জ্ঞান ও দক্ষতা দরকার তার ওপর ভিত্তি করে। তা ছাড়া আগামী প্রজন্ম যেন বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর, মানবিক ও কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, সেজন্য নীতি-নৈতিকতা, দেশাত্মবোধ ও মানবিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে সবার আগে চাই শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো। আমরা জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করছি। এ কারণে শিক্ষার সঙ্কট কাটছে না। সাথে সাথে এ কথাও মনে রাখা দরকার, শুধু সরকারের পক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।