ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের অর্থনীতির বারোটা বেজেছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত তছনছ হয়েছে। ফলে এ খাতে স্বাভাবিক গতি আনতে পেরেশানিতে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। হাসিনার আমলে তার ঘনিষ্ঠ গুটিকয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রের মদদে নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে যথেচ্ছ ঋণ নিয়ে ব্যাংকব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। সেই জের এখন তীব্রভাবে টানতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত বুধবারের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ এখন খেলাপি। অর্থাৎ দেশের ব্যাংকগুলো যত টাকা ঋণ দিয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশের বেশি খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের হিসাব করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে। গত জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। যার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি। শেখ হাসিনার প্রথম আমলেও ১৯৯৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪১ দশমিক ১ শতাংশ।

লক্ষণীয় বিষয় হলো- শেখ হাসিনার গত শাসনামলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর একটা অপপ্রয়াস ছিল। তথ্য বিকৃত করে লুকানোর প্রবণতাও ছিল। সঠিকভাবে হিসাব করায় সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি হার প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা, কিছুদিনের মধ্যে এই হার ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বাস্তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতি এত বেশি মাত্রায় হয়েছে যে, খেলাপি ঋণের এ উচ্চ হার সেই চিত্রের প্রমাণ।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতিও ব্যাপক হারে বাড়ছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে ব্যাংক আয় থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সঞ্চিতি হিসেবে রাখে। কোনো কারণে ঋণ আদায় না হলেও গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষা দেয়া হলো এর অন্যতম কারণ। প্রভিশন ঘাটতি হচ্ছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে না পারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। তিন মাস আগে যা ছিল তিন লাখ ১৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এ সময়ের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ২৪ হাজার ৫১১ কোটি টাকা।

ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশের পরিবর্তে বরং গোপন করেছে। তথ্য-উপাত্ত জালিয়াতি করে দেখিয়েছে মুনাফা। বিষয়টি আর কিছু নয়, আগের সরকারের আমলের অনিয়ম-দুর্নীতির ফল। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা হলো, খেলাপি ঋণের হিসাব হবে স্বচ্ছ এবং তথ্য-উপাত্তের জালিয়াতি আর করা যাবে না। তাই স্বাভাবিকভাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়লেও সত্য তথ্য উঠে আসছে, এটি একটি ইতিবাচক দিক।

অর্থনীতিবিদদের মতো আমরাও মনে করি, খেলাপি ঋণ থেকে ব্যাংক খাতকে বের করে আনতে হলে প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপির জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নইলে এই মন্দ সংস্কৃতি থেকে মুক্তি দূরপরাহত।