দেশের যেকোনো জায়গায় এক হাজার মানুষ জড়ো হলে তাদের মধ্যে ৩৩২ জন বা তারও বেশি সংখ্যক অসুস্থ। এর মধ্যে আবার ৫২ অথবা ৫৩ জন হলেন প্রতিবন্ধী। এরা শারীরিক, মানসিক প্রতিবন্ধিতার শিকার। এমনই তথ্য জানা গেল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে।

গত রোববার প্রকাশিত জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রতি ১০০ জন মানুষের মধ্যে গড়ে ৫ দশমিক ২ জনেরই কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা আছে। এই হার আবার নারীদের মধ্যে কিছুটা বেশি। প্রতিবন্ধিতা নিয়েই তারা জীবনযাপন করেন, সামাজিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শরিক হন এবং সাধ্যমতো নিজেদের ভূমিকা পালন করেন।

জরিপে জানা যাচ্ছে, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে অসুস্থতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতি হাজারে অসুস্থতার হার ২৩২ জন, যেখানে ৭৫-৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে তা ৭৫৪ জন। বয়স্ক নারীদের মধ্যে অসুস্থতার হার পুরুষদের তুলনায় বেশি।

চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, ব্যক্তিপ্রতি গড় চিকিৎসায় যায় দুই হাজার ৪৮৭ টাকা। প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে, মাত্র ১১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন মোট জনসংখ্যার মাত্র দুই শতাংশের কম মানুষ। প্রায় ৬০ শতাংশ প্রসূতির স্বাভাবিক প্রসব হয় না। সিজারিয়ান করতে হয়। এর সাথে চিকিৎসকদের অনৈতিক বাণিজ্যের সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ আছে। প্রতিটি সিজারিয়ান অপারেশনে গড়ে খরচ হয় ২২ হাজার ৬৫৫ টাকা। সার্বিকভাবে দেশের মানুষ চিকিৎসাসুবিধা কতটা পান সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

জরিপের তথ্য আমাদের স্বাস্থ্য পরিষেবার মারাত্মক দুর্বলতাই প্রকাশ করেছে। কিন্তু এর কারণ অজানা নয়। এ খাতে অর্থ বরাদ্দ যেমন কম, তেমনি নজরদারিও কম। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কতটা নাজুক ও ভঙ্গুর তা স্পষ্ট হয় কোভিড মহামারীর সময়, যখন মানুষ চিকিৎসার ন্যূনতম নিশ্চয়তা পায়নি। স্বাভাবিক সময়েও স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থা সহজে বোধগম্য। বাজেট বরাদ্দের দিকে তাকালেই সেটা স্পষ্ট হয়।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ জাতীয় বাজেটের ১২ শতাংশ হওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ১৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করে। বাস্তবে দেখা গেল, সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিলো জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আগের সরকারের সময় বরাদ্দ ছিল আরো কম। উপমহাদেশের সব দেশ এমনকি ভুটানের চেয়েও আমরা স্বাস্থ্য খাতে কম ব্যয় করি। ভুটান মোট জাতীয় বাজেটের সাড়ে আট শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়। বিশ্বের ৫১টি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে বাজেটের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, শুধু বাজেট বাড়ালেই স্বাস্থ্যসেবার মান রাতারাতি বেড়ে যাবে। এর জন্য দরকার হবে সমন্বিত উদ্যোগ এবং পরিকল্পনার। দূর করতে হবে অদক্ষতা, দুর্নীতি, মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা। মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণে বাজেটে বরাদ্দ করা অর্থও যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ও পুরোমাত্রায় ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।