বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির লাগামহীন ব্যবহার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সে জন্য সূর্যের আলো ব্যবহারের ধারণাটি আসে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না। এই প্রাকৃতিক উৎস বিদ্যুতের সীমাহীন আধার। বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলেও এটি খুব সীমিত পর্যায়ে আছে। এ ক্ষেত্রে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় চলমান বিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্প দেশের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি নমুনা হতে পারে। একই সাথে এটি পতিত জমির ব্যবহারের একটি উত্তম দৃষ্টান্ত হতে পারে।
নয়া দিগন্তে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মুক্তাগাছা উপজেলায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এডিবির ঋণ সহায়তায় ‘জুলস পাওয়ার লিমিটেড’ কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে। উপজেলায় শীত মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ৩০ মেগাওয়াট, গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ ৫০ মেগাওয়াট। স্থানীয় বাসিন্দারা লোডশেডিংয়ে নাকাল হন। তারা চাহিদার ৬০-৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পান।
উল্লিখিত নির্মাণাধীন কেন্দ্রটি থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। সে ক্ষেত্রে এলাকার বিদ্যুৎঘাটতি পূরণ করে এটি জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত অংশ সরবরাহ করতে পারবে। কেন্দ্রটি নির্মিত হচ্ছে একটি পতিত জলাভূমিতে। জমির মালিকরা এতদিন এখান থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা পেতেন না। ফলে এর আদলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পতিত অকৃষি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের একটি মডেল এটি হতে পারে। মুক্তাগাছার নিমুরিয়া গ্রামের ৭৪ একর জলাবদ্ধ দুর্গম জমিতে সোলার প্যানেলটি বসানো হয়েছে। ২২ বছরের জন্য বার্ষিক ইজারার ভিত্তিতে জমিগুলো নেয়া হয়েছে। মালিকরা জানাচ্ছেন, এ থেকে এখন তারা কিছু আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। এ প্রকল্পে এলাকার তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈশ্বিক অঙ্গীকার অনুযায়ী, বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফলতা নগণ্য। এখন পর্যন্ত মোট উৎপাদনের মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ এ খাত থেকে আসে। মুক্তাগাছায় নির্মাণাধীন কেন্দ্রটি আশাজাগানিয়া। বিশেষ করে অব্যবহারযোগ্য ভূমি ব্যবহারের কারণে। বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। বর্ধিত হারে শিল্প-কারখানা এবং বসতবাড়ি নির্মাণে এখানে প্রতিনিয়ত কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এ দিকে সারা দেশে বিপুল পতিত ভূমি রয়েছে। সেগুলো সহজে সৌরবিদ্যুৎ নির্মাণে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাতে করে কৃষিজমি কিংবা ব্যবহারযোগ্য জমি এতে বাঁচবে।
সৌরবিদ্যুৎ নির্মাণ ও এর ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে উচ্চ খরচের বিষয়। তবে মুক্তাগাছার কেন্দ্রটি থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে অর্থাৎ, আট টাকা ১২ পয়সা দরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। ভারতের আদানি গ্রুপের কাছে থেকে নেয়া দামের তুলনায় তা অনেক সাশ্রয়ী। আদানি থেকে এক ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে সর্বোচ্চ দিতে হয় ১৪ টাকা দুই পয়সা। সেই তুলনায় ৪০ শতাংশ কম দামে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। এটি ক্ষুদ্র একটি উদ্যোগ হলেও দেশের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে পতিত ভূমি ব্যবহারের একটি উত্তম নমুনা হতে পারে।