উপদেষ্টা পরিষদ গুমের বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে। এতে অপরাধের ধরন ও আওতা চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান নির্ণয় করা হয়েছে। পতিত হাসিনা সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে ক্রমাগত এই ভয়াবহ অপরাধ করছিলেন। এই মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতিকারে সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি কাঠামো ও শাস্তির বিধান না থাকার সুবিধা নিয়েছেন তারা। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গুমসংক্রান্ত এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনি দুর্বলতার মুখ বন্ধ করেছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার আন্তরিক হয়ে একে বাস্তবে রূপ দিলে গুম করে পার পাওয়া যাবে না।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫ নামে এর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সংবিধানে উল্লিখিত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার সমুন্নত করা এ আইনের উদ্দেশ্য। গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন যা বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এটি করা হয়েছে। অভিযোগপত্র দেয়ার ১২০ দিনের মধ্যে বিচার করতে হবে। গুমের বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

বিগত সময়ে কাউকে গুম করা অপরাধের মধ্যে গণ্য হতো না। সরকার গুমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে রীতিমতো ছিনিমিনি খেলেছে। আপনজনের অবস্থা কী, তা স্বজনদের জানার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। যারা গুম করতেন হাসিনা তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিলেন। গুমের শিকার ব্যক্তিকে মেরে ফেলা, যেকোনো ধরনের শাস্তি দেয়া কিংবা আটক রাখার অধিকার সংরক্ষণ করতেন। এ জন্য দেড় দশকে একজন অভিযুক্তকেও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি; বরং যারা এই নিষ্ঠুরতা করতেন, তাদের দ্রুত পদোন্নতি দেয়া হতো। গুমের ভয় দেখিয়ে মানুষের সম্পদ কেড়ে নিতেন।

নতুন আইনে উচ্চ শাস্তির পাশাপাশি গুমসংক্রান্ত অপরাধ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সঙ্গতকারণে গুমের সাথে জড়িত কেউ আর পার পাবেন, সে সুযোগ থাকবে না। নতুন আইন অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য এমনকি সরকারের কোনো কর্মচারী কাউকে গ্রেফতার, আটক, অপহরণ অথবা স্বাধীনতা হরণ করলে তারা সাজা পাবেন। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যাদের সমর্থনে এটি করা হবে; তারাও শাস্তির আওতায় আসবেন। পাশাপাশি গ্রেফতার, আটক, অপহৃত ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণ, তার অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি গোপন রাখা এবং ওই ব্যক্তিকে আইনগত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করাও এ আইনে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমসংক্রান্ত বিষয়ে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সংস্থাটি গুমের যেকোনো ব্যাপারে তদন্ত ও মামলা করতে পারবে।

শেখ হাসিনার আমলে গুমকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের একটি টুল বানানো হয়। বিরোধী মত দমন করে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়। গুমের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের প্রতিকারে কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও একই কারণে গুমের প্রতিকার করা যাচ্ছিল না। অধ্যাদেশটি ওই অচলায়তন ভেঙে দিয়েছে। এটি কার্যকর করা গেলে যতগুলো গুমের ঘটনা ঘটেছে এবং এ সংক্রান্ত যত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, অনায়াসে বিচারের আওতায় আনা যাবে। নতুন করে গুম চালুর সুযোগও এটি বন্ধ করবে বলে আশা করা যায়।