খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রাসায়নিক সার। নানা কারণে সারের উৎপাদন সীমিত। গ্যাসের অভাব এবং কারখানার প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় সরকারি সার কারখানার উৎপাদন সীমিত হয়েছে। যমুনা ও আশুগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ সার কারখানা নিয়মিত উৎপাদন চালু রাখতে পারছে না। বাজারে সারের সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। কৃষক অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে কৃষিকাজে ব্যয় বেড়েছে।

গতকাল নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক বাড়তি ব্যয় বহন করতে না পেরে আবাদ কমিয়ে দিচ্ছেন বা বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অভ্যন্তরীণ কৃষি উৎপাদন কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন সবসময় যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য পেতে পারে তা নিশ্চিত করা। খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম দিক হলো জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য এতটা সুলভ করতে হবে যাতে কোনো নাগরিক কখনোই প্রয়োজনীয় খাবারের অভাবে না ভোগে। এটিই খাদ্যনিরাপত্তা।

প্রতিটি ব্যক্তি ও তার পরিবারের যেন এমন সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তাদের খাবারের কোনো অভাব না থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে দেশে বিদ্যমান বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। দেশে বর্তমানে এক কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং প্রায় ১৬ লাখ শিশু অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। খাবারের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিস্তার, জ্বালানি সঙ্কট এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা ইত্যাদি কারণে খাদ্যনিরাপত্তা এখন অনিশ্চিত।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বহুলাংশেই কৃষি উৎপাদনে স্বনির্ভরতার ওপর নির্ভরশীল। আর কৃষিতে স্বনির্ভরতার জন্য সবার আগে দরকার কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে সার অন্যতম উপকরণ। সেটিই এখন হুমকির মুখে। টিএসপি ও ডিএপি সারের সরবরাহে ঘাটতি আছে। কৃষক বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কেবল ইউরিয়া কিনে শুধু সেটিই প্রয়োগ করছেন। এতে জমির উর্বরাশক্তি নষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ মাটির জৈবগঠন ও পুষ্টি ভারসাম্য নষ্ট করছে। এতে ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদন আরো কমতে পারে, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য শঙ্কার। এর সাথে যোগ হচ্ছে সার আমদানিতে বিপুল অর্থের ভর্তুকি। আমদানিনির্ভরতা একই সাথে খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। এই অবস্থায় সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এটি শুধু কৃষির সমস্যা নয়, জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি এবং সার্বিক নিরাপত্তাও এর সাথে সম্পৃক্ত।

এই মুহূর্তে সরকারকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গুরুত্ব দিতে হবে। সারের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কারখানাগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করা, অবিলম্বে সব কারখানার সংস্কার এবং পুরনো যন্ত্রপাতি পাল্টে ফেলতে হবে। পাশাপাশি ইউরিয়া ছাড়াও অন্য সব রাসায়নিক সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।