অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে অবশেষে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেছে। ভুক্তভোগীরা বিচ্ছিন্নভাবে দীর্ঘদিন ধরে যা বলে আসছিলেন, তার সত্যতা মিলছে উল্লিখিত প্রতিবেদনে। যারা দেশ রক্ষার দায়িত্ব পেয়েছিলেন তারাই এই নৃশংস হত্যার পেছনে কাজ করেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে বিডিআরের ৫৭ কর্মকর্তাকে হত্যা করে মূল অপরাধীদের আড়াল করে। পিলখানায় ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ওই ঘটনায় ১৭ বেসামরিক ব্যক্তিও প্রাণ হারান। ঘটনার দায় ধামাচাপা দিতে শেখ হাসিনা বহু বিডিআর সদস্যকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন। ফাঁসানো হয় ঘটনার সাথে সম্পর্কহীন নিরপরাধ ব্যক্তিদের। এখন একটি স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে বর্বরতম এই কালো অধ্যায়ের দায়মুক্তি হতে পারে।
জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত। হাসিনার পক্ষ থেকে মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন এমপি ফজলে নূর তাপস। তাকে সহায়তা করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের লোকেরা। ঘটনার সময় দফায় দফায় তারা মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকে খুনিদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। অন্যদিকে মির্জা আযম, সাহারা খাতুনসহ আরেকটি গ্রুপ হাসিনার নির্দেশে অপরাধী বিডিআর সদস্যদের সাথে মিলে ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ভিত্তি রচনা করেন। অথচ এ সময় পিলখানার পাশে প্রস্তুত র্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। একই সময় সেখানে প্রবেশ করে বাইরের অচেনা বহু লোকজন।
কমিশনের প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে, ওই সময়ে ভারতীয়দের সন্দেহজনক আনাগোনা এবং বিশেষ বিমানে করে এক দল ভারতীয়কে বিমানবন্দর দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় চলে যেতেও দেয়া হয়েছে। কমিশন এ তথ্যও পেয়েছে, বেশ কিছু ভারতীয় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল; তাদের বৈধভাবে বের হওয়ার কোনো তথ্য আর পাওয়া যায়নি। এ হত্যাকাণ্ডে ভারতীয় সম্পৃক্ততার বড় প্রমাণ হাজির করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উদ্দিন আহমেদ। কমিশনের কাছে দেয়া বক্তব্যে তিনি স্বীকার করেন, ভারতের পক্ষ থেকে হুমকি থাকায় তারা পিলখানায় সেনা অভিযান চালাতে পারেননি। এদিকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিক সে সময় সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি আলাদা কমান্ড স্ট্রাকচার গড়ে তোলেন। তারা হাসিনার সাথে ষড়যন্ত্র করে বিডিআর হত্যাকাণ্ড ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেন। এদের কর্মকাণ্ড ছিল দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের বদলে যারা এ হত্যাকাণ্ডে শোক জানিয়েছেন কিংবা প্রতিবাদের চেষ্টা করেছেন, তাদের অন্যায়ভাবে দমন করা হয়েছে। তাদের কেউ হত্যার শিকার হয়েছেন, কেউ চাকরিচ্যুত ও গুম হয়ে যান। এভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে হাসিনা এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা ভারতের সহায়তায় ধুলায় মিশিয়ে দেয়। এর সূত্র ধরে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন কায়েমের পথ প্রশস্ত হয়।
প্রতিবেদনের ভাষায় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, তারা সব ধরনের চাপ উপেক্ষা করে তদন্ত চালিয়েছেন। সে কারণে এতদিন ধরে মানুষের মনে জমে থাকা প্রশ্নের উত্তর এতে মিলেছে। তদন্ত কমিশন এর মাধ্যমে অঙ্গীকার পূরণ করেছে। এখন সরকারের দায়িত্ব পিলখানা হত্যা ও তার পরবর্তী ঘটনায় যারা রাষ্ট্রীয় পীড়নের শিকার হয়েছেন; তাদের বিচার পাওয়ার পথ প্রশস্ত করা। সাথে সাথে পার্শ্ববর্তী দেশের হস্তক্ষেপের প্রতিকার পেতে উদ্যোগ নেয়া।