গত ১৩ নভেম্বর রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের সামনে এক ব্যক্তির ২৬ টুকরা লাশ উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি বেদনাদায়ক, ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগজনক। জানা যাচ্ছে, এই নৃশংস হত্যার কারণ পরকীয়া প্রেম।

দেশে পরকীয়া প্রেম ও বিয়েবিচ্ছেদের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত বছর প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক রিপোর্টে বলা হয়, তালাক ও দাম্পত্য বিচ্ছেদের প্রধান কারণ পরকীয়া, যা ২২ দশমিক ৬ শতাংশ। এরপরই রয়েছে দাম্পত্য অক্ষমতা, যা সংসার ভাঙার জন্য ২২ দশমিক ১ শতাংশ দায়ী। দেশে একসময় নানা রোগের মহামারী দেখা দিত। শহরে ও গ্রামে দারিদ্র্যও ছিল অত্যধিক। রোগশোক, দারিদ্র্র্য থেকে মুক্তি মিললেও পরকীয়ার মতো নৈতিক অবক্ষয়জনিত ব্যাধি দিন দিন জাতিকে গ্রাস করছে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ভার্চুয়াল যোগাযোগব্যবস্থায় যে বিপ্লব ঘটেছে তা অভূতপূর্ব। ‘বিশ্ব জগত দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে’ বলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে সঙ্কল্প করেছিলেন, বর্তমান যুগ যেন তারই বাস্তব রূপ। ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগের এই সহজলভ্যতা অনেক ক্ষেত্রেই অপসংস্কৃতির সয়লাব সৃষ্টি করেছে, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অধঃপতন ঘটিয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়; বরং সারা বিশ্বেই এই অধঃপতন দেখা যাচ্ছে। এতে সমাজে দেখা দিচ্ছে অশান্তি, অস্থিরতা।

কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি সমাজ ও সংস্কৃতির দেশে একবিংশ শতাব্দীর এসব পরিবর্তনের ক্ষতিকর দিক মোকাবেলায় যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার দরকার ছিল তা নেয়া হয়নি। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কিছু প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেলেও রাষ্ট্র ছিল উদাসীন।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় ধর্ম বরাবরই একটি বিশেষ ফ্যাক্টর। এখানকার মানুষের জীবনযাপনের বড় অংশ ধর্মকে ঘিরে আবর্তিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, শাসকগোষ্ঠী দেশের মানুষের ধর্মবিশ্বাসের বিষয়টি কখনোই গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়নি; বরং পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির আলোয় আমাদের সামাজিক সমস্যার প্রতিকার করতে চেয়েছে। এতে সমাজ থেকে অবক্ষয় দূর হয়নি; বরং দিনে দিনে বেড়েছে।

নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় শুধু আইন দিয়ে রোধ করা যায় না। আইন করে মানুষের নৈতিক চরিত্রের উন্নয়নও সম্ভব নয়। এ জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে নানাবিধ উদ্যোগ প্রয়োজন। মানুষের মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা ও তার বিকাশে ব্যবস্থা নিতে হবে। এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। সবচেয়ে বড় যে কাজটি করতে হবে, তা হলো- শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে। ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে সুস্থ স্বাভাবিক নৈতিক জীবনযাত্রার শিক্ষা দেয়, মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার প্রেরণা দেয়। সারা বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা নৈতিক দিক থেকে উন্নত মানুষ গড়ার জন্য ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলেন। তাই বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।