চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও দেশত্যাগ, জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি এবং পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর সাময়িক শূন্যতার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে বিশেষ রেফারেন্স পাঠান। অনুচ্ছেদটি সাধারণত অতি বিরল পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়- যখন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রচলিত সাংবিধানিক ধারা ছাড়িয়ে যায়। তখন সুপ্রিম কোর্টের মতামত রাষ্ট্রের নির্বাহী সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নেপালে এ ধরনের নজির রয়েছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে করা একটি রিট সর্বসম্মতভাবে খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ফলে সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক বৈধতার মূল উৎস হিসেবে জনগণকে স্থাপন করেছেন। এর আগে ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি রায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি অনন্য পরিস্থিতিতে ১০৬ অনুচ্ছেদে মতামত নিয়েছেন। মতামত অনুযায়ী যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, তা আইনি দলিল এবং জনগণের ইচ্ছা- উভয় দ্বারা সমর্থিত।
আপিল বিভাগের সর্বসম্মত আদেশ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতাকে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দিলো। এ আদেশ শুধু একটি নির্দিষ্ট রিট খারিজ নয়- যা রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্তৃত্ব, বিচার বিভাগীয় ব্যাখ্যা এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। এ রায়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো গণ-অভ্যুত্থান একটি সংবিধানসম্মত রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে স্বীকৃতি পেল। রিটকারী হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে লিভ টু আপিল করেন; যা গত বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে খারিজ করে দেন।
সাধারণত রাষ্ট্রে নির্বাহী ক্ষমতার বৈধতা আসে সংবিধান থেকে। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে তা আসতে পারে জনগণের প্রত্যক্ষ ইচ্ছায়। এটি আসলে জনগণের সার্বভৌমত্ব থেকে সাংবিধানিক অনুমোদন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে নির্বাচন প্রস্তুতি, বিচার ও দায়মুক্তি পর্যালোচনা, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের আইনি ভিত্তি প্রশ্নাতীত হলো। সেই সাথে ‘সাংবিধানিক শূন্যতা’ বিতর্কেরও অবসান ঘটিয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রয়োগিত সাংবিধানিক ক্ষমতা শূন্যতা পূরণ করেছে। এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি নতুন তত্ত¡ তৈরি করে, তা হলো- জরুরি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার মতবাদ।
ইতালিতে রাজতন্ত্র পতনের পর জনগণের সাংবিধানিক ইচ্ছা নির্বাহী সরকারের বৈধতার প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেন আদালত। নেপালেও রাজতন্ত্র পতনের পর আদালতের ক্রান্তিকালীন অনুমোদন; বিচার বিভাগ সাময়িক প্রশাসনকে জনগণের ‘সম্মিলিত রাজনৈতিক ম্যান্ডেট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বর্ণবাদ-উত্তর দক্ষিণ আফ্রিকায়ও আদালত এমন রায় দিয়েছেন। তাতে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের ইচ্ছানির্ভর ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের দেয়া রায় একই ধারার অংশ। যাতে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। প্রকৃত বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে ‘রাষ্ট্রহীন মুহূর্তে’ পড়তে দেয়া যায় না, যা আন্তর্জাতিক আইনেও স্বীকৃত। শীর্ষ আদালতের সর্বসম্মত এ রায় রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা এড়ানো জন্য- এটি না হলে দীর্ঘস্থায়ী বিচারিক অনিশ্চয়তা নতুন সঙ্কট তৈরি করত।
ঐতিহাসিক এ রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সময় একটি স্থিতিশীল পথের দিশা পেল। এখন রাষ্ট্রের সামনে প্রধান দায়িত্ব- একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন, বিচার ও দায়মুক্তি পর্যালোচনা, রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতি প্রতিষ্ঠা করা। এ রায় আমাদের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী নজির হয়ে থাকবে।