ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের চাহিদা পড়ে গেছে। সার্বিকভাবে ইইউর পোশাক আমদানি কম হওয়াই এর কারণ। যেসব দেশ থেকে ইইউ পোশাক আমদানি করে, সেই দেশগুলোর সবার রফতানি কমেছে। বিশেষ করে ইরান এবং ইউক্রেন যুদ্ধে ইইউ দেশগুলোতে নিত্যপণ্য ছাড়া অন্য সব পণ্যের চাহিদা কমেছে।
এতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রফতানি কমেছে ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ফলে রফতানি আয় কমেছে। অন্য দিকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের রফতানি আয় কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। চীনের কমেছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া ভারতের ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, তুরস্কের ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১৭ দশমিক ১ শতাংশ রফতানি কমেছে। তবে ভিয়েতনাম উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকে এবং ইউনিটমূল্য বাড়িয়ে বাজার ধরে রেখেছে। চীন রফতানির পরিমাণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ পোশাকের বাড়তি দামও ধরতে পারেনি, আবার পরিমাণও বাড়াতে পারেনি।
আমাদের তৈরী পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় বাজারের পতন নিছক উদ্বেগের বিষয় নয়, এটি অর্থনীতির জন্য অশনিসঙ্কেত। কারণ শ্রমবাজার বাদ দিলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্য যেসব প্রধান খাত যেমন- চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্য ইত্যাদির সম্মিলিত আয় তৈরী পোশাকের আয়ের তুলনায় সামান্য।
এ জন্য তৈরী পোশাক রফতানি কমে যাওয়ার অর্থ হতে পারে অর্থনীতির অনিবার্য বিপর্যয়। ইউরোপের বাজার ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে শিগগির রফতানি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর গুরুতর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পোশাক খাতের সমস্যা জরুরি ভিত্তিতে চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
দেশীয় গার্মেন্ট শিল্পের মালিকরা বলছেন, জ¦ালানি সরবরাহে সঙ্কট, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর পণ্য উৎপাদন করে সরবরাহ করতে অতিরিক্ত সময় লাগা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ডলার সঙ্কট এবং কাঁচামাল আমদানির জটিলতায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অনেক কারখানা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। আবার বাংলাদেশের পোশাকের দাম কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ দেশীয় রফতানিকারকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ক্রয়াদেশ কমতে থাকায় অন্যের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ নেন। এতে বিদেশের বাজারে সার্বিকভাবে বাংলাদেশী পণ্যের দর কমে যায়। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর যে পরিস্থিতি দাঁড়াবে তাও অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা বিবেচনায় রাখেন। মধ্যম আয়ের দেশ হলে বাংলাদেশ অনেক শুল্কসুবিধা হারাবে। সেই পরিস্থিতি নিয়েও এখনই ভাবতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একবার বিদেশী ক্রয়াদেশ হারিয়ে ফেললে যত চেষ্টা করা হোক, ক্রেতা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। তখন এ খাতের বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হবে। এর মানে বিপুল মানুষ বেকার হয়ে পড়বেন। তাতে অনিবার্যভাবে সামাজিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হবে। তাই দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের রুটি-রুজির উৎস তৈরী পোশাক খাত বাঁচানোর বিকল্প নেই। আর যা করার এখনই করতে হবে।