অপরাধ ও বিচার বিভাগের ইতিহাসে ২০১৬ সালের ২০ মার্চ একটি কালো দিন। ওই দিন কুমিল্লা সেনানিবাসের সুরক্ষিত এলাকার ভেতর থেকে ভিক্টোরিয়া কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। আশা করা হয়, সেনানিবাসের মতো নিরাপত্তা এলাকায় সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে, বিচারের প্রক্রিয়া বারবার হোঁচট খেয়েছে। পুরো বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতার অন্ধকারে ডুবে গেছে। দীর্ঘ এক দশক পর সেই জমাট অন্ধকারে আলো দেখা দিয়েছে। তনু হত্যা মামলায় প্রথম কোনো অভিযুক্ত হিসেবে সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। ১০ বছরের দীর্ঘ অচলায়তন ভেঙে আদালতের এই কার্যকর পদক্ষেপকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

তনু হত্যা সাধারণ কোনো অপরাধ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার আস্থার ওপর আঘাত। গত ১০ বছরে মামলার তদন্তভার চারটি সংস্থার হাতবদল হয়েছে, সাতজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে এবং ৮০টি ধার্য তারিখ পেরিয়ে গেছে। ডিএনএ পরীক্ষায় তিনজন পুরুষের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারপরও এতদিন কোনো অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়নি। অথচ এই ১০টি বছর তনুর বাবা ইয়ার হোসেন এবং মা আনোয়ারা বেগমের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস।

প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলোর রহস্যজনক ধীরগতি ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত করেছে। তনুর বাবা অভিযোগ করেছিলেন, তখনকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পরিবারের সংশ্লিষ্টতা ছিল। আর এ কারণেই তদন্ত এগিয়ে যেতে দেয়া হয়নি। এমনকি প্রকাশ হওয়া দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে পাওয়া গেছে বিপরীত তথ্য। প্রথম ময়নাতদন্তে হত্যা বা ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। দ্বিতীয় তদন্তের পর জানানো হয়, ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। এগুলো ছিল সাধারণ মানুষের চোখে ধুলা দেয়ার বাহানা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদালতের ভূমিকা প্রশংসনীয়। পিবিআইয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সন্দেহভাজন তিনজনের ডিএনএ ক্রস-ম্যাচ করার নির্দেশ দেয়া হয়। একজনকে রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়। এটি প্রমাণ করে, আইনের গতি যথানিয়মে এগোচ্ছে। দেরিতে হলেও আদালত দৃঢ়তা দেখিয়েছে। এতে তনুর পরিবারসহ দেশের মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে।

আমরা আশা করি, রিমান্ডে থাকা আসামির তথ্য এবং বাকি সন্দেহভাজনদের ডিএনএ নমুনার সাথে তনুর পোশাকে পাওয়া নমুনার ক্রস-ম্যাচে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। তদন্তের এই পর্যায়ে কোনো অদৃশ্য শক্তির প্রভাব যেন কাজ না করে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। এখন আর কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই মামলার নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। এটি হতে পারে জনগণের সামনে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ যে, নতুন সরকারের সময় দেশে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

তনুর পরিবার এবং মামলার সাক্ষীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মনে করি, পর্দার আড়ালে থাকা খুনিদেরকে বের করে আনা উচিত। আর যেন ন্যায়বিচার সময় ও ক্ষমতার কাছে হার না মানে।