সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) উপজেলার শিবরাম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সাতবার জাতীয় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জন করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সুনাম আর খ্যাতি ছিল। হাজারো শিক্ষার্থীর কোলাহলে মুখরিত ছিল ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সৃজনশীলতা, পাঠদান পদ্ধতি আর নানারকম বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল প্রতিষ্ঠানটিতে। প্রথম জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক অর্জন করে ১৯৮৫ সালে। সারা দেশে বিদ্যালয়টির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সে গৌরব আর নেই। বিদ্যালয়টি আগের সুনাম হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমানে এটি শিক্ষার্থী সঙ্কটে পড়েছে। এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৫০ জন। গত পাঁচ বছরে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় অর্ধেক। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার ঘটনা শুধু এই বিদ্যালয়েই নয়, উপজেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই ঘটেছে।
একটি দৈনিকের স্থানীয় সংবাদদাতার খবর অনুযায়ী, উপজেলার ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক। বাস্তবে শিক্ষার্থী আছে অর্ধেক। অনেক বিদ্যালয়ে ৫০-এর বেশি শিক্ষার্থী থাকলেও উপস্থিত মাত্র ৩০-৩৫ জন। অর্থাৎ- বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে দ্বিগুণ ভর্তি দেখানো হয়েছে। উপবৃত্তি সুবিধা পাওয়ায় অনেকেই স্কুলের খাতায় নাম লিখিয়েছে।
উপজেলায় ২৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৪টি, অনিবন্ধিত ১১৭টি। তবে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সঙ্কট দেখা দিলেও জমজমাট কিন্ডার গার্টেনগুলো। অফিসের রেকর্ডে ১২১টি কিন্ডার গার্টেন থাকলেও বাস্তবে দুই শতাধিক। শিক্ষার্থী ৪০ হাজার। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছেড়ে শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে কিন্ডার গার্টেনে।
বাড়তি যত্নের কারণে অভিভাবকরা বেসরকারি কিন্ডার গার্টেনের দিকে ঝুঁকছেন। তবে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিলেও সুফল মিলছে না।
অভিভাবকরা বলছেন, সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের অদক্ষতা আর পাঠদানে গাফিলতির কারণে বিদ্যালয়গুলোর এমন দশা। তারা সন্তানের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলতে চান না।
উপজেলার ১৫ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা মিলে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৫৯টি। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকসহ মোট শিক্ষক রয়েছেন এক হাজার ২৫০ জন। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মোট শিক্ষার্থী ৩৬ হাজার ৫৭৪ জন। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৬ হাজার থাকলেও শিক্ষার্থীর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা এর অর্ধেক।
শিবরাম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক (জাতীয় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক) ও ন্যাশনাল প্রাইমারি এডুকেশন কনসালট্যান্ট কমিটির সদস্য নুরুল আলম বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করা হলেও পড়াশোনার মান প্রশ্নবিদ্ধ।
মানসম্মত শিক্ষা ও বাড়তি যত্নের অভাবে শিক্ষার্থী সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ জরুরি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিক আশরাফ বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যথাযথ তদারকির অভাব, নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, শিক্ষকদের অনাগ্রহের কারণে শিক্ষার্থীরা বিমুখ হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক দুরবস্থায় অনেক শিশুকে পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে উপার্জন করতে হচ্ছে।
সবার জন্য শিক্ষা। এই স্লোগান পুরনো। কিন্তু মানহীন শিক্ষক দিয়ে সবার জন্য শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন আদৌ সম্ভব নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যথাযথ তদারকি, নিয়মিত ক্লাস নেয়া এবং শিক্ষকদের নিষ্ক্রিয়তা দূর করা জরুরি। তাহলেই কেবল সবার জন্য শিক্ষা অর্জন সম্ভব।