বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষিপণ্যের মধ্যে এদেশে ধান উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয়। ফসলি জমির ৮০ শতাংশে ধান আবাদ হয়। ধান উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি কৃষিশ্রমিক নিয়োজিত। মূলত আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত হওয়ায় প্রয়োজনের তাগিদে চাষাবাদ হয়। প্রধান ফসল হওয়ার পরও ধান চাল উৎপাদন বিপণন টেকসই ব্যবস্থাপনা দেশে গড়ে ওঠেনি। এতে কৃষকরা যেমন প্রতিনিয়ত ঠকছেন; একইভাবে ঠকছেন চাল কিনে ভোক্তারাও। লাভের গুড় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খান মধ্যস্বত্বভোগীরা। তাদের নিতে হয় না তেমন একটা ঝুঁকি। এবারো আমন ধান ওঠার শুরু হতে দেখা যাচ্ছে কৃষক ঠকানোর আগের কৌশল।

আমন ধান মাঠ থেকে উত্তোলন শুরু করেছেন কৃষক। নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুরুতে বাজারে দাম পাচ্ছেন না কৃষক। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশ কম দামে কৃষকদের ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। নীলফামারী, দিনাজপুর ও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় বাজারে শুকনো গুটি স্বর্ণা ধানের মণ এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। গত বছর মৌসুমের শুরুতে এর দাম ছিল এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৩২০ টাকা। শম্পা কাটারি জাতের ধান মণপ্রতি এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৫৫০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। এ ধান গত মৌসুমের শুরুতে এক হাজার ৬৩০ টাকা বিক্রি হয়েছে।

এদিকে বাজারে চালের দাম কমেনি। বিশেষ করে ঢাকার বাজারে নিম্ন ও মাঝারি চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকার বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে দাম পড়ে যাওয়ার পেছনে দেদার ভারতীয় চালের আমদানির প্রভাব পড়েছে। ভারত থেকে আমদানি চাল প্রতি কেজি ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা। প্রতিদিন বাজারে আড়াই হাজার টনের বেশি চাল আমদানি হচ্ছে। বছরে উৎপাদিত চাল আমাদের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট। কাগজে কলমের হিসাবে অন্তত তাই দেখা যায়। তার পরও একটি কৃত্রিম সঙ্কট বাজারে দেখা যায়।

মূলত মৌসুমের শুরুতে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন কৃষকদের মধ্যে যারা প্রান্তিক। এদিকে ব্যবসায়ীদের একটি দুষ্টুচক্র তাদের অসহায়ত্ব পুঁজি করে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য করেন। ধানের কম দামের পেছনে এ ধরনের দুষ্টুচক্র যারা রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা দরকার। এদিকে সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সাত লাখ টন ধান-চাল কেনার ঘোষণা দিয়েছে। শুকনো ধানের কেজি ৩৪ টাকা এবং সিদ্ধ চালের কেজি ৪৯ টাকা, আতপ চালের কেজি ৪৮ টাকা দরে সরকার কিনবে। ঘোষণা অনুযায়ী, সরকার ধান-চাল কিনলে প্রান্তিক কৃষকের জন্য তা স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

সাধারণত মৌসুমের শুরুতে ভোক্তাদের দামে একটু স্বস্তি পাওয়ার কথা। আবার দাম এতটা কমবে না, যাতে কৃষক উৎপাদন মূল্যের কমে তার ধান বা চাল বিক্রি করতে বাধ্য হন। কিন্তু দামের একটি ভারসাম্য বাজারে পাওয়া যায় না। বাজার সিন্ডিকেটের অশুভ তৎপরতায় বরাবর কৃষক ও ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন। দুর্ভাগ্য আমাদের, না সরকার, না কৃষক কোনো পক্ষই একটি টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে সিন্ডিকেট সবসময় অবৈধভাবে সুযোগ লুটে নিচ্ছে। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে।