দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার সরবরাহ নিয়ে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে কিছু অর্থলোভী ঠিকাদার। নিম্নমানের বাসি ও পচা খাবার খেয়ে কয়েকটি স্কুলে বেশ কিছু শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক স্কুলে খাবার দেয়ার এ প্রকল্প ভালো উদ্যোগ— তাতে সন্দেহ নেই। শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার বাড়ানো, তাদের অপুষ্টি দূর করা এবং শিশুদের লেখাপড়ায় আগ্রহী করে তোলা এ প্রকল্পের লক্ষ্য। বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় দেশের আটটি বিভাগে ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ৩১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে দুপুরের খাবার দেয়া হচ্ছে। এ জন্য আট বিভাগে আটজন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। বাকি খাবার সরবরাহ করতে ১৫০ উপজেলায় ২০টি প্যাকেজে ভাগ করে ২০ জন ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
প্রকল্প থেকে ইতিবাচক ফলও মিলছে। স্কুলে উপস্থিতির হার বেড়েছে। ভবিষ্যতে সারা দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই প্রল্প চালুর কথাও ভাবা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে দেশের দুই কোটি প্রাথমিক শিক্ষার্থী পর্যায়ক্রমে প্রকল্পের আওতায় আসবে। সর্বজনীন শিক্ষা বাস্তবায়নে এর প্রয়োজন আছে।
এ মুহূর্তে দুপুরের খাবার হিসেবে সপ্তাহে পাঁচ দিন দেয়া হচ্ছে— বাটার বান, কেক, সিদ্ধ ডিম, প্যাকেটজাত দুধ ও কলা। প্রতিটি খাবার দ্রুত পচনশীল। ঠিকাদার টাটকা অবস্থায় সরবরাহ করলেও বেশি সময় প্যাকেটবন্দী থাকলে এবং গরমের সময় এগুলো সহজে পচে বিষাক্ত হতে পারে। তবে এ দেশে ঠিকাদারদের অর্থলোভের বহু দৃষ্টান্ত সবার জানা। শুধু স্কুল ফিডিংয়ে নয়, দেশের সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগী এবং কারাগারে বন্দীদের জন্য সরবরাহ করা খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। ঠিকাদাররা নিম্নমান ও পরিমাণে কম দিয়েও রোগীর খাবারের বরাদ্দ থেকেও অর্থ হাতিয়ে নেন।
এ নিয়ে শুধু ঠিকাদার দোষী এমনও নয়। খাবার ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত কর্মকর্তারাও অবৈধ সুবিধা নিয়ে থাকেন। ফলে ঠিকাদারের সরবরাহ করা খাবার যথাযথভাবে পরীক্ষা ও পরিমাপ করা হয় না। অনেক ঠিকাদার স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। তাদের ওপর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ থাকে সামান্যই।
এ প্রেক্ষাপট মনে রেখে স্কুল ফিডিং প্রকল্পের সমস্যাটি দেখতে হবে। ঠিকাদারের পাঠানো খাবার নিবিড় পরীক্ষার পর গ্রহণ করতে হবে, যাতে শিশুদের মুখে বিষ তুলে দেয়া বন্ধ হয়। এর মধ্যে অভিযুক্তদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পেশাদারিত্ব নিশ্চিত হয়ে ঠিকাদার নিয়োগ দিতে হবে। এটি যেন দলীয় নেতাকর্মীকে ঠিকাদারির সুযোগ দেয়ার হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তাও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়। একই সাথে এই গরমের দেশে দুপুরে কী ধরনের খাবার স্বাস্থ্যসম্মত হতে পারে, কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুততর করা যায় কি না, সে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়াও আবশ্যক। তবে সবচেয়ে বড় কথা— নিয়মিত নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। খাবার যদি বিষ হয়ে যায় তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য যতই ভালো হোক তা বরবাদ হতে বাধ্য।