গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে উঠতেই সামনে কুয়াশার মতো ঘন ধোঁয়া। কিন্তু সেটি কুয়াশা নয়, পুড়ে যাওয়া বর্জ্যরে বিষাক্ত ধোঁয়া। এতে দিনের আলো ঝাপসা হয়ে এসেছে। বাতাসে ছড়িয়েছে ঝাঁঝালো গন্ধ। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে দক্ষিণ ঢাকার ডেমরা, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, মানিকনগরসহ বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষের। গত কয়েক দিন ধরেই চলছে এ অবস্থা। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও রক্ষা নেই; চোখ জ্বালা করে, শিশু ও বৃদ্ধরা কষ্ট পাচ্ছেন সবচেয়ে বেশি।

ধোঁয়ার উৎস রাজধানীর সবচেয়ে বড় ভাগাড় মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল। আবর্জনাভূমিটিতে কয়েক দিন ধরে আগুন জ্বলছে। আগুনের ধোঁয়া ঢেকে দিচ্ছে অর্ধেক নগর। এ আগুন সাময়িক নয়; এটি বহুদিনের অব্যবস্থাপনার বিস্ফোরণ। পাঁচ বছর আগে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মাতুয়াইল ভাগাড় থেকে বিপুল মিথেন গ্যাস নির্গত হচ্ছে, ঘণ্টায় প্রায় চার হাজার কেজি। সে সময় এটিকে বাংলাদেশের গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের একটি বড় ‘হটস্পট’ বলা হয়েছিল।

মিথেন এমন এক গ্যাস, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে বহুগুণ বেশি তাপ ধরে রাখতে পারে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়াতে দ্রুত প্রভাব ফেলে। ওই সময় কমিটি গঠনের কথা বলেছিল সরকার। সমাধানের উদ্দেশে পরিকল্পনার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পর আমরা দেখছি একই ভাগাড়ে আগুন, একই বিষাক্ত ধোঁয়া। সমস্যা যেখানে ছিল, সেখানেই থেকে গেছে।

ঢাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসবের বড় অংশ ঠিকভাবে পৃথকীকরণ ছাড়াই ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়। জৈব বর্জ্য পচে মিথেন গ্যাস তৈরি হয়, গ্যাস জমে আগুনের ঝুঁকি বাড়ায়। বিজ্ঞানসম্মত ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা না থাকলে আপনা-আপনি এমন আগুন লেগে যেতে পারে।

সমস্যা কেবল ল্যান্ডফিলে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ ঢাকার বহু এলাকায় গড়ে উঠেছে লোহা গলানো মিল, প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কারখানা, বর্জ্য পোড়ানোর অস্থায়ী ইউনিট। এসব প্রতিষ্ঠানের ধোঁয়া প্রায়ই আকাশ ঢেকে দেয়। এতে পুরো এলাকা ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীবনমান ঝুঁকির মুখে।

এই সঙ্কটের সমাধান অসম্ভব নয়। সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্য পরিণত হতে পারে সম্পদে। ল্যান্ডফিল থেকে গ্যাস সংগ্রহ করা যেতে পারে। এতে মিথেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে আসবে। উৎস থেকেই বর্জ্য পৃথকীকরণ বাধ্যতামূলক করা এখন জরুরি। জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা না করলে কোনো আধুনিক ব্যবস্থাই কার্যকর হবে না। উন্মুক্ত বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ করে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ওয়ার্ডভিত্তিক কম্পোস্টিং ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করে বিকেন্দ্রীভূত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এতে ভাগাড়ের ওপর চাপ কমবে। একই সাথে শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণে আধুনিক ফিল্টার ও স্ক্রাবার বাধ্যতামূলক করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বায়ুদূষণ ও মিথেন নিঃসরণের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

মাতুয়াইলের ধোঁয়া কেবল দক্ষিণ ঢাকার আকাশ ঢেকে দেয়নি; এটি আমাদের নীতি ও পরিকল্পনার ফাঁকফোকর খুলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।