দেশে নতুন গ্যাসকূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস ও বাখরাবাদ ফিল্ডে দু’টি গভীর অনুসন্ধান কূপ খনন করা হচ্ছে। এর মধ্যে তিতাস গ্যাস ফিল্ডে নতুন একটি কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। এটি হবে দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গভীর গ্যাসকূপ। পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার গভীর এ কূপ থেকে চারটি স্তরে গ্যাস পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। এতে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও চলতি বছরের মধ্যে ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যখন চরম ভঙ্গুর অবস্থায়, তখন এটি দেশের জন্য বড় খবর।

আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে দেশে জ্বালানি অনুসন্ধানে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ রেখে ২০১৮ সাল থেকে নগদ অর্থে তরলীকৃত গ্যাস আমদানি শুরু করে সে সময়ের সরকার। ২০২৩ সাল থেকে দেশে গ্যাসের মজুদ কমতে থাকে। আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ করা হয়, সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহের বাণিজ্য রমরমা হয়ে ওঠে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতেও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানাগুলো বন্ধ হতে শুরু করে। অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়ে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদরা তখন থেকে দেশের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন; কিন্তু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে আওয়ামী সরকার বিপুল বাড়তি ব্যয়ে নগদ অর্থে এলএনজি আমদানি থেকে সরে আসেনি। তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ প্রায় অচল হয়ে পড়ে; কারণ এ খাতে আওয়ামী সরকার দীর্ঘ ১২ বছরে মাত্র আট হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।

গত সাত অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে দুই লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি। যদিও এলএনজি দিয়ে দেশের মোট সরবরাহকৃত গ্যাসের ২০-২৫ শতাংশ পূরণ হয়।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, অভ্যন্তরীণ গ্যাসের জোগান না থাকায় এলএনজি আমদানির কোনো বিকল্পও নেই। বিপুল অর্থ ভর্তুকি দিয়ে বর্তমান সরকারকেও এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। সম্প্রতি এলএনজি ও জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ করেছে সরকার। এই ভর্তুকির মধ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে এলএনজি আমদানিতে। অবশিষ্ট সাত হাজার কোটি টাকা যাবে ডিজেলের মতো জ্বালানি আমদানিতে। এটি সবার জানা, এলএনজি আমদানির একটি বড় অংশ আসে স্পট মার্কেট থেকে। ফলে সরবরাহকারী দেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা জ্বালানির চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতে হয়। এ মুহূর্তে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ভর্তুকির অর্থ দিয়ে স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানি করতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশীয় জ্বালানির উৎস অনুসন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বিষয়টি অনুধাবন করছে বলে গভীর কূপ খনন শুরু করেছে। তিতাস ও বাখরাবাদের গভীর অনুসন্ধান কূপ খননে সুফল পাওয়ার আশা করা হচ্ছে, তা পূরণ হলে গ্যাস সঙ্কট হয়তো কেটে যাবে। তবে সার্বিকভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশের ভূমি ও সমুদ্রসীমায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালানোর বিকল্প নেই।