ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের একটি বড় অংশ কোটিপতি। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

গত সোমবার সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২৩৬ জন কোটিপতি, যা মোট সংসদ সদস্যের ৭৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তাদের মধ্যে শত কোটিপতি আছেন ১৩ জন। দলভিত্তিক হিসাবে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ১৮৯ জন কোটিপতি। জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত কোটিপতির সংখ্যা ৩৮ জন।

অন্য দিকে এবার ৪৫ জন ঋণখেলাপি নির্বাচন করার সুযোগ পান। এদের মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়েছেন। আমাদের জন্য এটি ভালো কোনো খবর নয়। আমরা এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে ঋণখেলাপিদের উৎসাহ দিচ্ছি।

সংসদ সদস্যদের সম্পদশালী হওয়া দোষের কিছু নয়। দোষের হলো— সংসদ সদস্য হওয়ার পর অবৈধভাবে কাঁড়ি কাঁড়ি সম্পদের মালিক বনে যাওয়া, যা পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের মধ্যে দেখা গেছে। আমরা বিশ্বাস করি, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সেই পথে পা বাড়াবেন না। একই সাথে জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন করে সমাজ বদলে দেবেন।

সংসদ সদস্যদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা— তারা নিজেদের সেবায় না থেকে জনসেবা করবেন। এ বিষয়ে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন-আইপিইউর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্লামেন্ট সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক উত্তরদাতা (৫২.৩ শতাংশ) আইনপ্রণয়ন-সংক্রান্ত কাজকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অপর দিকে জনসাধারণের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক উত্তরদাতার (৩৬.৪ শতাংশ) মতে, নাগরিক সমস্যা সমাধান হলো পার্লামেন্ট সদস্যদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সংসদ সদস্যদের সংসদকেন্দ্রিক কার্যাবলি ও নির্বাচনী এলাকার জনপ্রত্যাশা পূরণ— দু’দিকেই দৃষ্টি দেয়া দরকার। অতীতের সরকারগুলোর মধ্যে দেশব্যাপী উন্নয়নের ক্ষেত্রে একধরনের বৈষম্য লক্ষ করা গেছে। কিছু জেলায় নানা কারণে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন করা হলেও অনেক জেলা উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন না, সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে। উন্নয়নের এই বঞ্চনা রোধ করতে হবে। সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য— উভয়ের এলকায় উন্নয়নের সুষম বণ্টন প্রয়োজন। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিটি জেলায় উন্নয়নমূলক কাজ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও লেখক অ্যাডমন্ড বার্ক ১৭৭৪ সালে বলেছিলেন, একজন সংসদ সদস্যের কাছে নির্বাচনী এলাকার জনসাধারণের ইচ্ছা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাওয়া উচিত। একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্ব হলো— তার বিশ্রাম, আনন্দ, সন্তুষ্টি জনসাধারণের জন্য উৎসর্গ করা ও সর্বোপরি, সর্বদা এবং সর্বক্ষেত্রে তাদের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের ওপর প্রাধান্য দেয়া।

আমরা মনে করি, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নির্বাচনের আগে যেমন মানুষের দ্বারে দ্বারে ভোটের জন্য গিয়ে তাদের নানাবিদ সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার করেছেন, তেমনিভাবে এখনো তারা জনগণের পাশে থেকে তাদের ভাগ্যোন্নয়নের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন।