প্রয়োজনের তাগিদে রুটি-রুজির জন্য আমাদের দেশেও বিপুল সংখ্যক নারীকে ঘরের বাইরে কাজ করতে হয়। কর্মজীবী নারীর কর্মক্ষেত্র ও সংসার- উভয় স্থানে সমানভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু শিশুসন্তানের নিরাপদ জায়গা অর্থাৎ- ডে-কেয়ারের অভাবে নারীদের বাইরে কাজ করা একটি কঠিন বাস্তবতা। কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় দেশে দিন দিন ডে-কেয়ারের চাহিদা বাড়ছে; কিন্তু সে অনুযায়ী ডে-কেয়ারের সংখ্যা বাড়ছে না। এই প্রেক্ষাপটে অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে পারছেন না; শুধু সন্তানের দেখাশোনার বিকল্প না থাকায়; ফলে তাদের যোগ্যতা-দক্ষতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

আগে যৌথ পরিবার ছিল। শাশুড়ি বা মায়ের কাছে শিশুসন্তানকে রেখে যাওয়া যেত। এখন সে সুযোগ নেই বললেই চলে। কর্মজীবী নারীদের এই সমস্যা উত্তরণে সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে সরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিশুযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা। সরকার দেশব্যাপী ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করে কর্মজীবী নারীদের কাজের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। একই সাথে ডে-কেয়ার সেন্টারকে একটি সেবামূলক ব্যবসায় হিসেবে বিবেচনা করে বেসরকারি উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসতে পারেন। তাহলে কর্মজীবী মায়েদের জন্য ক্যারিয়ার ও সন্তানের নিরাপত্তা বৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।

এক সময়ে সরকারি পর্যায়ে ডে-কেয়ার সেন্টার বা দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত হতো। নারীকে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত করতে তা করা হয়। কথা ছিল দিবাযত্ন কেন্দ্র দেশব্যাপী আরো বৃহৎ পরিসরে দাঁড়াবে। তা হয়নি। বিভাগীয় শহরগুলোয় আংশিকভাবে করা হয়েছে। কর্মজীবী নারীর জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের অপ্রাপ্যতা একটি বড় সমস্যা। তবে প্রান্তিক নারীদের জীবনে স্বস্তি এনে দিতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার শেখা (ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি-বেইজড চাইল্ডকেয়ার, আইসিবিসি) প্রকল্প পরিচালনা করছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি।

যেসব এলাকার শিশুরা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত, দরিদ্র ও ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি- সেসব এলাকায় কাজ করতে চায় সরকার। বর্তমানে ১৬ জেলার ৪৫টি উপজেলায় ‘শিশুযত্ন কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের নিরাপদ দিবাযত্নের সুযোগের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক আবদুল কাদির জানান, আরো ১৫ জেলায় এ প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। এ প্রকল্প স্থানীয়দের দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় তারা নানাভাবে ভূমিকা রাখছেন।

নারীকে অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হলে দরকার শ্রমবাজারে যুক্ত করা। যদি সন্তানের জন্য জনগোষ্ঠীর অর্ধেক শ্রমবাজার থেকে দূরে থাকে; তাহলে সমাজের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নতি শ্লথ হয়ে পড়বে। সঙ্গত কারণে ডে-কেয়ারের পরিধি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু কর্মজীবী নারীদের সাহায্য করবে না; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।