সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে তরুণ কর্মক্ষম জনশক্তি সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসেছে। কোনো দেশে কাজের উপযুক্ত জনশক্তি যখন এই স্তরে পৌঁছায়, তাকে আশীর্বাদ বলা হয়। উন্নয়নে এই বাড়তি জনশক্তি ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশ উপকৃত হয়। আমাদের ক্ষেত্রে তেমনটি সম্ভব হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে দেশের সবচেয়ে বেশি বেকারত্ব বিরাজ করছে। স্নাতকোত্তর পাস করে তরুণরা কোনো কাজ পাচ্ছেন না। এমন কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, অচিরে দেশের কর্মসংস্থান ব্যাপক হারে বাড়বে, যাতে করে বিপুল কর্মক্ষম শক্তি ব্যবহার করে দেশ উন্নয়নের শক্তিশালী ধারায় পৌঁছাবে। তবে এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি।
জাতিসঙ্ঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৫ সালের জনসংখ্যা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৫-৬৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠী ১১ কোটি ৫০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বেশি। এ বয়সী জনসংখ্যা সবচেয়ে কর্মক্ষম হয়। কোনো একটি দেশের জন্য জনসংখ্যার বড় অংশ এ বয়সের মধ্যে আসা সৌভাগ্যের। একে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতির মুনাফা বলা হয়। জনমিতির মুনাফা কাজে লাগিয়ে সমসাময়িক বিশ্বে অনেক দেশ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তবে এর জন্য দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। বর্ধিত জনসংখ্যাকে উন্নয়নে হাতিয়ার পরিণত করতে অগ্রিম পরিকল্পনা দরকার হয়। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। দুর্ভাগ্য বাংলদেশ এমন একসময় জনসংখ্যার ইতিবাচক ধাপে এসেছে, যখন দীর্ঘ দুঃশাসন অতিক্রম করে স্থিতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ হয়েছে। আগের বছর একই সময়ে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে মোট শ্রমশক্তির সাড়ে ২৫ লাখ বেকার ছিল। পরের বছর তা বেড়ে হয় ২৭ লাখ।
বাস্তবে এই বেকারত্ব আরো বেশি। বিশেষত কৃষিতে ৪৫ শতাংশ কর্মে নিয়োজিত দেখানো হয়। আসলে এ শ্রমশক্তির বড় অংশ ছদ্ম বেকার। আবার কৃষকের বেশির ভাগ অংশের বছরের দীর্ঘ সময়ে কোনো কাজ থাকে না। অন্যান্য খাতেও কমবেশি পরিস্থিতি এমনই। এদের মধ্যে যুবকদের বড় একটি অংশ বেকার। লক্ষণীয়, উচ্চশিক্ষিতরা বেশি বেকার। বিবিএসের জরিপ, স্নাতকোত্তর যুবকদের ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ বেকার। কার্যত শ্রমশক্তির যে অংশটি সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষম, তারাই কাজ পাচ্ছেন না।
নতুন সরকার বেকারত্ব দূর করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ক্ষমতায় এসেছে। কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তিসহ সব খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের আলাদা আলাদা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এককভাবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে সরকার এক লাখ লোক নিয়োগ করবে। এ ছাড়া শিল্প পার্ক নির্মাণ, কৃষিতে সহজ ঋণসহ দেশব্যাপী উদ্যোক্তা তৈরির কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে আসল কথা হলো— এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— জনমিতি মুনাফার সুযোগের সদ্ব্যবহার বা কাজে লাগানো। দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে আমরা যদি ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে উন্নয়নের সদর রাস্তায় পৌঁছাতে পারব।