বাজার পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন অবস্থায় পড়েছে। অর্থনৈতিক সঙ্কটে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নাভিশ্বাস ওঠার দশা।

একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে পরিস্থিতির যে চিত্র উঠে এসেছে তা উদ্বেগজনক। বলা হয়েছে, নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা, পরিবহন ব্যয়, সন্তানের লেখাপড়াসহ সব খাতেই খরচ বেড়েছে বিপুলভাবে। কিন্তু আয় বাড়েনি; বরং কমেছে। সেই সাথে আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ। সবমিলিয়ে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সাধারণ মানুষকে এখন সংসারের খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, ধারদেনা করতে হচ্ছে এবং নানাভাবে খরচ কমানোর চেষ্টা করতে হচ্ছে। কেউ কেনাকাটা কমিয়ে, কেউ পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। প্রত্যেকের জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হয়ে পড়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে যাদের অবস্থান তারা অবর্ণনীয় অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। তাদের ঠিকমতো দুই বেলা খাবারও জুটছে না।

গবেষণাটি করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার-পিপিআরসি। গবেষণায় দেখা যায়, একটি পরিবারের মাসিক মোট খরচের প্রায় ৫৫ শতাংশ চলে যায় খাবার কেনায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, একটি পরিবারকে শুধু খাবারের পেছনে মাসে ব্যয় করতে হচ্ছে ৩১ হাজার ৫০০ টাকা।

এই পরিস্থিতি এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে বৈশ্বিক নানা কারণ ছাড়াও দেশের রাজনীতিকদের বড় ভূমিকা আছে। আছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও বাণিজ্য প্রতিযোগিতার অবদান, যা আমাদের অর্থনীতিতেও প্রভাব রাখে। কিন্তু এসবের বাইরে আমাদের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই; বরং এটিই মূল কারণ বলে আমাদের ধারণা।

পুনরুক্তি হলেও বলতে হবে, গত ১৫ বছরে দেশের অর্থনীতিতে যে নির্বিচার লুটপাটের সংস্কৃতি চালানো হয়েছে তাতে পুরো ব্যাংক খাত ধসে গেছে। অবিশ্বাস্য পরিমাণ ঋণের অর্থ খেলাপি হয়েছে, যা আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দেশ থেকে অবৈধভাবে বিপুল অর্থ পাচার এবং অবাধ দুর্নীতি অর্থনীতির শিরদাঁড়া নড়বড়ে করে দিয়েছে। সিন্ডিকেট ও মজুদদারির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে পণ্যমূল্য বাড়ানো হয়েছে খোদ ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে। ফলে পণ্যের দাম বাড়ে।

এর সাথে বিবেচনায় রাখতে হবে ১৫ বছরের গণবিরোধী একনায়কতান্ত্রিক দুঃশাসনের কুফলের বিষয়টিও। ১৫ বছরে দেশে ন্যূনতম গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় দেশে সুষ্ঠুভাবে কোনো কিছুই চলতে পারেনি। সে সময় বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, এভাবে চললে দেশে গুরুতর সঙ্কট দেখা দিতে পারে; কিন্তু তাতে কেউ কর্ণপাত করেনি। আজ যে সঙ্কট দেখা যাচ্ছে, এর পেছনে এটিই মূল কারণ।

২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর দেশ সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে যাবে এবং সবকিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হবে বলে মানুষ আশাবাদী হয়েছিল; কিন্তু বর্তমানে রাজনীতিতে বিভেদের যে আলামত দেখা যাচ্ছে, তাতে জনমনে নতুন করে সংশয় দেখা দিচ্ছে।

রাজনৈতিক স্থিতি ছাড়া পরিস্থিতি উত্তরণের কোনো পথ নেই। কিন্তু বলতে গেলে তেমন সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। মানুষ রাজনীতিকদের দিকেই তাকিয়ে আছে।