অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক সংস্কারের রূপরেখা সামনে আনে। রাষ্ট্র হিসেবে গণতান্ত্রিক বিকাশে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো এতে রাখা হয়। আশা ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী পক্ষগুলো ইতিবাচকভাবে একে গ্রহণ করবে। সহজে বাস্তবায়ন করা যাবে। বাস্তবে দেখা গেল, কিছু রাজনৈতিক দল এই সংস্কারপ্রক্রিয়াকে সঙ্কুচিত করা এবং একে যথেষ্ট কার্যকর হতে না দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে না পারায় অন্তর্বর্তী সরকার অনেকটা বাধ্য হয়ে সনদ বাস্তবায়নের যথেষ্ট শক্তিশালী রূপরেখা সামনে আনতে পারেনি। পক্ষগুলোকে আস্থায় রাখতে গিয়ে সংস্কারের উদ্দেশ্য এতে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের আয়োজনে রচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কৌশল প্রণয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দলগুলো এ নিয়ে একমত হতে পারেনি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে তাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা ঘোষণা করেন। ড. ইউনূসের প্রস্তাবনায় বড় দলের দাবি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। ভিন্নমত গণভোটের কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। এতে জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও নির্বাচনে জয়ী রাজনৈতিক দলের তা বাদ দেয়ার এখতিয়ার থাকবে। দেখা যাবে, একটি মাত্র দল সংস্কারে ভিন্নমত পোষণ করেছে; তারাই আবার জয়ী হয়ে তা বাদ দিয়ে দিচ্ছে। এতে মৌলিক সংস্কার বাদ পড়ে যেতে পারে।
গণভোটে জনগণের সামনে একটি সাধারণ প্রস্তাব রাখা হয়। যা সরল ও স্পষ্ট হয়। একজন সাধারণ মানুষের তা বুঝতে অসুবিধা হয় না, ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোন অপশনটি সে বাছাই করবে। প্রস্তাবিত গণভোটে চারটি অপশন রাখা হয়েছে। একজন গড় বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে এগুলো পড়ে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। যেখানে আমাদের ভোটারদের বড় অংশের প্রয়োজনীয় অক্ষরজ্ঞান নেই। মনে হচ্ছে, এক বছর ধরে ঐকমত্য কমিশন গবেষণা করেছে। সেই গবেষণার বিস্তারিত ভোটারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ভোটাররা যেন গবেষণার ফল ঘোষণা করেন। এতে করে আসলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হলো ভোটারের ওপর। এর ওপর সাধারণ ভোটের দিন গণভোট ধার্য করায় সৃষ্টি হবে বাড়তি জটিলতা। ওই স্বল্প সময়ে তারা কি উপযুক্ত প্রার্থী বাছাই করবেন, না বিস্তারিত পড়ে গণভোটের টিক মার্ক দেবেন। এ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনে তাদের ভোটদান নিঃসন্দেহে অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে। এটি ভোটারদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেয়ার শামিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সংস্কার সাধন। যে কারণে ছাত্র-জনতার বিপুল আত্মত্যাগ। পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে তা সাধারণ একটি সরকার পতন ও তার পরবর্তী ক্ষমতার হাতবদলের নিয়মে পর্যবসিত হলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। অন্তত যেটুকু সংস্কারের আলোচনা প্রস্তাব আকারে কমিশন জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ করেছে; ততটকু যাতে বাস্তবায়িত হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সে ব্যাপারে দৃঢ় অঙ্গীকার থাকা দরকার। যে সুযোগ এসেছে এটি বাংলাদেশের জন্য আগামী এক শতাব্দীতে না-ও আসতে পারে। এ ব্যাপারে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল হতে হবে, জনগণের এটিই চাওয়া।