গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কারে স্থানীয় সরকার দেশব্যাপী প্রকল্প পরিচালনা করে। নগদ অর্থের পাশাপাশি খাদ্যের বিনিময়ে এসব প্রকল্প সম্পন্ন করা হয়। এ ধরনের প্রকল্প দরিদ্র খেটেখাওয়া ও বেকার মানুষকে রুটিরুজি উপার্জনের সুযোগ করে দেয়। দুর্বল অর্থনীতির দেশে এই প্রকল্প বেশ কার্যকর। এক দিকে অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটানো যায়, অন্য দিকে এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার হয়। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয় স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এসব প্রকল্প লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

সহযোগী একটি দৈনিক মাদারীপুর সদর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে উন্নয়ন প্রকল্পে বেশুমার অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর দিয়েছে। টেস্ট রিলিফ (টিআর) কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় রাস্তা পুনর্নির্মাণ, বক্স-কালভার্ট নির্মাণ, মসজিদ-মন্দির সংস্কার ও কবরস্থানে মাটি ফেলতে সাত কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। সরেজমিন দেখা যায়, চাহিদা অনুযায়ী ওই সব এলাকায় প্রকল্পের কাজ হয়নি। অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে দুদকের তদন্ত শুরু হলে এলাকার ১১টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পালিয়ে গেছে। প্রাথমিক তদন্তে দুদক জানতে পেরেছে, বরাদ্দের অর্থ তসরুপ করা হয়েছে।

মাদারীপুরের এসব এলাকা দুর্গম। এখানে কাঁচা রাস্তায় ইট বসানো, কিছু রাস্তায় পিচ ঢালাইসহ সংস্কারের জন্য প্রকল্প নেয়া হয়। রাস্তাগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। রোগী, সন্তানসম্ভবা নারীদের নিয়ে এলাকাবাসী বেশি বিপদে পড়েন। যানবাহন চলাচলে অনুপযোগী হওয়ায় তাদের লাশ বহনের খাটিয়ায় করে নিয়ে যেতে হয়। এ ধরনের বহু রাস্তা চলাচলের একেবারে অনুপযোগী। বরাদ্দ হওয়ার পরও সংশ্লিষ্টরা কাজ করেনি। বাধ্য হয়ে স্থানীয় জনগণ একজোট হয়ে অনেক জায়গায় এ ধরনের রাস্তা মেরামত করছে। এ দিকে রাস্তা নেই কিন্তু ভুতুড়ে প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দ নেয়া হয়েছে। মসজিদ ও কবরস্থান উন্নয়ন প্রকল্পের টাকাও সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। দেখা গেছে, গণকবর বলে বরাদ্দ নিয়ে নিজের পারিবারিক কবরস্থানে সেটি ব্যয় করা হচ্ছে। রয়েছে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। একজন ইউপি সচিবের স্ত্রীর প্রতিষ্ঠান একাই পেয়েছে ছয়টি প্রকল্পের কাজ। এ দিকে স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, প্রকল্প বরাদ্দের ১০ শতাংশ দিয়ে দিতে হয় ইউএনওকে।

টিআর, কাবিখা, কাবিটা গ্রামীণ উন্নয়ন ও অর্থনীতির জন্য কার্যকর উদ্যোগ। কয়েক যুগ আগে থেকে এসব প্রকল্পের প্রচলন হয়েছে। ঠিকভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ সুফল পেত। জনজীবনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। প্রশাসনের নিম্নস্তরের একশ্রেণীর আমলা ও জনপ্রতিনিধির দুর্নীতির কারণে এগুলো সফলতা পাচ্ছে না। মাদারীপুর সদর উপজেলার প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে ইতোমধ্যে দুদক প্রতিবেদন দিয়েছে। যেসব আমলা ও জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদের উপযুক্ত বিচার হতে হবে।

গ্রামীণ উন্নয়নের প্রকল্প সাধারণত ছোট আকারের হয়ে থাকে। তাই এগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের বেশি মনোযোগ থাকে না। তাদের আরো আন্তরিক হতে হবে। বিশেষ করে অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।