উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রামে চরাঞ্চলের শিশুরা দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। একটি সহযোগী জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরের বেশির ভাগ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়; কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে তাদের খুব কমসংখ্যকেরই মাধ্যমিক স্তরে পড়ালেখার সৌভাগ্য হয়।

কুড়িগ্রাম দেশের দারিদ্র্যপীড়িত জেলার একটি। গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত দারিদ্র্যবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের উচ্চ দারিদ্র্যভুক্ত জেলার মধ্যে কুড়িগ্রামের নাম রয়েছে। এমন একটি দারিদ্র্যপীড়িত জেলার দুর্গম চরাঞ্চলের শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে- এটি কাক্সিক্ষত না হলেও অস্বাভাবিক নয়।

এই জেলায় অভাব এত প্রকট যে, দারিদ্র্যের কারণে স্কুলের ঘণ্টা বাজার আগে ওই অঞ্চলের শিশুদের হাতে উঠে আসে কোদাল, কিংবা গরুর দড়ি। কোদালকাটি চর গ্রামের গৃহবধূ সেলিনা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে ক্লাস ফোরে পড়ে; কিন্তু এখন কাজ না করলে ভাত জুটবে না। স্কুলের ব্যাগ আর কৃষিকাজের কোদালের ভার একসাথে বহন করা সম্ভব হয় না সবার পক্ষে।’

কুড়িগ্রামের জেলা শিক্ষা অফিসার শামসুল আলম বলেন, ১৬টি নদ-নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এই জেলার মূল ভূখণ্ডের তিন ভাগের এক ভাগ চর। চরে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় এখানকার শিশুরা লেখাপড়ায় বেশিদূর এগোতে পারে না। পরিবারের অভাব দূর করতে বাবা-মায়ের সাথে কাজে জড়িয়ে পড়ে।

দারিদ্র্যের জন্য কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের শিশুরাই শুধু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত নয়; এমন বাস্তবতা সারা দেশেই বিদ্যমান। মূলত দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ জনপদে এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে; যেসব পরিবারে এখনো শিক্ষিত কেউ নেই। এ জন্য ওই সব পরিবারের সচেতনতার অভাব স্বীকার করে নিয়েও বলা যায়, কোনোভাবে রাষ্ট্র এর দায় এড়াতে পারে না। আসলে গরিববান্ধব না হওয়ায় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা সব সুযোগ-সুবিধা অগ্রসর জনগোষ্ঠীকে দিতে সদা তৎপর। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার কিয়দংশই বরাদ্দ হয়।

আমাদের জানা নেই, প্রতি বছর কতজন নিম্নবিত্ত পোশাককর্মী, রিকশাওয়ালা কিংবা কুলি-মজুরের সন্তান উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। সেই সংখ্যা যে খুব অল্প তা সহজে অনুমেয়।

আমরা এমন একটি সমাজে বাস করি, যেখানে দরিদ্ররা নিয়তি মনে করে সুবিধাবঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন। এ অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠেীকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। অথচ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাপনায় সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হোক তা শিক্ষা কিংবা অন্য কিছু।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বলতে চাই, দেশের চরাঞ্চলসহ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের বিশেষ নীতি-কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি। অনগ্রসরতার ভিত্তিতে অঞ্চলভেদে শিক্ষায় সরকারকে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া অপরিহার্য।