৫ আগস্ট হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশ নিয়ে নানা প্রকার গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে পাশের দেশ ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে অপপ্রচার ছিল আঁতকে ওঠার মতো। বলা হয়েছিল- বাংলাদেশ তার পথ হারিয়েছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। দেশী-বিদেশী এসব অপপ্রচারের মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ নিয়ে ওয়াশিংটন-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) যে জরিপ প্রকাশ করেছে, তা বেশ আশাপ্রদ। আইআরআইয়ের জরিপে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, গণতন্ত্র, দুর্নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে। চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগে আইআরআই জরিপটি পরিচালনা করে।
জরিপের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ৮০ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ ‘খুবই আশাবাদী’। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৩ শতাংশ মনে করেন- দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে, যেখানে ৪২ শতাংশ ভিন্নমত দিয়েছেন। উন্নতির কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও খাদ্যনিরাপত্তা। অন্য দিকে যারা মনে করেন দেশ ভুল পথে যাচ্ছে, তারা প্রধান কারণ হিসেবে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখিতা দায়ী করেছেন।
২১ শতাংশ নাগরিক দুর্নীতিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন আর ১৮ শতাংশের কাছে বড় সমস্যা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা। দেশের নাগরিকদের বড় একটি অংশের মত, চাকরি পেতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হতে হয়। ৩০ শতাংশ মানুষের ভাবনা এমনই। অন্য দিকে ১৮ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, সরকারি জাতীয় চুক্তিগুলোয় দুর্নীতি হয়। ৪৮ শতাংশ মানুষ আগামী বছর দেশের অর্থনীতি আরো ভালো হবে বলে মনে করেন। মাত্র ১৮ শতাংশ মনে করেন, অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপের দিকে যাবে। ৭২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রয়েছে।
বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা বাংলা ভ্রমণ করে এখানকার নাম দিয়েছিলেন দোজখ-ই-পুর নিয়ামত বা প্রাচুর্যপূর্ণ দোজখ। নদ-নদী, বর্ষা আর শীতের কারণে আবহাওয়ার যে বিরূপ অবস্থা বিরাজ করে সে কারণে তিনি এ অঞ্চলকে দোজখের সাথে তুলনা করেছিলেন। অন্য দিকে বাংলার সমৃদ্ধি ও ভূমির উর্বরতার কারণে ইবনে বতুতা এ অঞ্চলকে প্রাচুর্যপূর্ণ বলেছেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সমৃদ্ধ বাংলায় আজ ক্ষুধা আর দারিদ্র্য নিত্যদিনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
যেকোনো দেশের শাসকগোষ্ঠীই সে দেশের উন্নতি ও অগ্রগতিতে নেতৃত্ব দেয়। শাসকগোষ্ঠী যদি লুটপাট করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়, তখন দেশের টেকসই উন্নয়ন স্বপ্নই থেকে যায়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়স মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার চেয়ে খুব বেশি না; কিন্তু মালয়েশিয়া আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। আর বাংলাদেশ এখনো উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকেই বের হতে পারছে না। রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রে কর্তৃত্বপরায়ণতা, বৈষম্য আর বঞ্চনা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করেছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজিয়ে গণতন্ত্রকে সুসংহত করার সুযোগ এসেছিল। দীর্ঘ পাঁচ দশকেও সে সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সুযোগ আবার এসেছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সুসংহত করে দেশকে উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার। এই সুযোগ আর হাতছাড়া করা যাবে না। দেশের শাসনব্যবস্থাকে একটি শক্তিশালী ইনসাফপূর্ণ কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার সব ব্যবস্থা করতে হবে।