বাংলাদেশ সবসময়ই কৃষিনির্ভর দেশ এবং কৃষিই আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের সব সরকারই কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং নানা ধরনের কৃষিবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন করেছে বলেই কোনো সময়ের তুলনায় আমাদের কৃষি উৎপাদন এখন অনেক অনেক বেশি। কিন্তু খাদ্য উৎপাদনে এই অভাবনীয় সাফল্যের বিপরীতে কৃষিজমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষায় আমরা যেন এখন একেবারেই নির্বিকার। আর এ কারণেই অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যত্রতত্র আবাসন, ইটভাটা, কলকারখানা, বাগানবাড়ি ও রিসোর্টের কারণে আমাদের আহারের জোগান দেওয়া কৃষিজমি প্রতিদিন ভয়ংকর হারে কমে সবুজের সমাহারকে গিলে খাচ্ছে।

আমার নিজের বাড়ি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার শিদলাই গ্রামে। পেশাগত কারণে এখন ঢাকায় থাকি। যখনই কর্মব্যস্ত শহর ছেড়ে নাড়ির টানে গ্রামে যাই, পথের দুই ধারের দ্রুত বদলে যাওয়া দৃশ্য বুকটাকে বিষণ্ণ করে তোলে। যে রাস্তায় একসময় দুই পাশে কেবলই মৌসুমের ফসলের ক্ষেত দেখা যেত, চিরচেনা সেই ফসলি জমির বুক চিরে আজ মাথা তুলছে বহুতল বাড়ি, দোকানপাট, নতুন সড়ক আর বাণিজ্যিক স্থাপনা। সম্প্রতি শিদলাইয়ে ফিরে এক কৃষকের সঙ্গে কথা হলো। সে বলল, "বাবা, জমি বেচে ঢাকায় গিয়েছিলাম ব্যবসা করতে। কিন্তু শহরে গিয়ে দেখি, টাকাও শেষ, জমিও নেই। এখন খালি হাতে ফিরে এসে দাঁড়িয়ে আছি।" চোখে দেখা এই নির্মম পরিবর্তন শুধু আমার শিদলাই গ্রামের নয়; এটি আজ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—সমগ্র বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের এক অভিন্ন ও আত্মঘাতী প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতিবছর রাস্তাঘাট উন্নয়নের নামেও বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। নতুন নতুন চার থেকে আট লেনের সড়ক, দৃষ্টিনন্দন সেতু, আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে, বিশেষ শিল্পাঞ্চল ও আবাসন প্রকল্প দেশের অর্থনীতিকে দৃশ্যত চাঙা করছে। কিন্তু এই চোখধাঁধানো উন্নয়নের আড়ালে নীরবে, নিভৃতে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান ও অপরিবর্তনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ—কৃষিজমি। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও উর্বর ফসলি জমি কংক্রিটের নিচে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল কোনো একটি খাতের ক্ষতি নয়; এটি সরাসরি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর এক চরম আঘাত।

কৃষি এখানে কেবল জিডিপির কোনো শুষ্ক পরিসংখ্যান নয়; এটি এ দেশের কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং হাজার বছরের সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ০.৭ থেকে ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে, যা বার্ষিক প্রায় ৬৮ থেকে ৮০ হাজার হেক্টর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে দেখা গেছে, গত এক দশকে দেশে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৮ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর (২ কোটি ১৮ লাখ একর) আবাদযোগ্য কৃষিজমি রয়েছে, যা দেশের মোট আয়তনের ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আপাতদৃষ্টিতে এই পরিমাণকে বিশাল মনে হলেও প্রতি বছর জনসংখ্যা যেভাবে ২০ লাখের বেশি বাড়ছে, সেই তুলনায় মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। একদিকে জ্যামিতিক হারে মুখ বাড়ছে, অন্যদিকে গাণিতিক হারে আবাদি জমি কমছে, যা আমাদের এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।

এই জমি হারানোর গতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। কারণ, খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিই যখন মূল প্রস্তাবনা, তখন বছরে প্রায় ১ শতাংশ হারে আবাদি জমি হারানোর অর্থ কী দাঁড়ায়, তা সহজেই অনুমেয়। মাত্র এক দশকে আমরা হারাবো প্রায় ৮ লাখ হেক্টর জমি, যা থেকে প্রতি বছর উৎপাদিত হতে পারত বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য—যা কোটি কোটি মানুষের এক বছরের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। অথচ এই উর্বর জমি একবার হারালে তা আর কোনো উপায়েই ফিরে পাওয়া যাবে না। এই বাস্তব চিত্র আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

অভ্যন্তরীণ এই সংকটের পাশাপাশি বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিও আমাদের জন্য চরম উদ্বেগজনক। জলবায়ু পরিবর্তনের মরণকামড়ে খরা, অসময়ের বন্যা, উপকূলের লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেশের কৃষি উৎপাদনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ফসলি জমি ধ্বংস মানে শুধু খাদ্যই কমছে না; কমছে দেশের প্রাকৃতিক জলধারণ ক্ষমতা, বাড়ছে তাপমাত্রা, বিলীন হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য। সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ বন্যাগুলোতে আমরা এর প্রমাণ দেখেছি—অপরিকল্পিতভাবে জলাশয় ভরাট ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস করায় বন্যার পানি জমে থেকেছে দীর্ঘদিন। অন্যদিকে, বৈশ্বিক যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও কৃষি উপকরণের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে সার ও খাদ্যের বৈশ্বিক দামের যে অস্থিরতা চলছে, তা আমাদের আরও একবার কঠোরভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—খাদ্যের জন্য পরনির্ভরশীলতা কখনো নিরাপদ নয়। যে দেশ নিজের উর্বর কৃষিজমি রক্ষা করতে পারে না, বৈশ্বিক সংকটের দিনে কোনো অর্থ বা ডলার দিয়েও সে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশ কৃষিজমি সুরক্ষায় কঠোর 'লাল রেখা' নীতি চালু করেছে, যেখানে কৃষিজমিকে অন্য খাতে রূপান্তর করা প্রায় অসম্ভব ও আইনত দণ্ডনীয়। অথচ আমরা এখনো মাঠপর্যায়ে আইনের কঠোর প্রয়োগে পিছিয়ে রয়েছি।

কিন্তু দুশ্চিন্তার মাঝেও আশার কথা আছে। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির এই পরিবর্তনশীল সময়ে বাংলাদেশ এখনো অনেক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন নীতিমালায় খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) যৌথভাবে উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু-সহিষ্ণু ধান (যেমন লবণাক্ততাসহিষ্ণু ব্রি ধান-৯৭, ব্রি ধান-৯৯ কিংবা খরাসহিষ্ণু জাতসমূহ), ডাল, ভোজ্যতেল ও মসলাজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশেষ করে সরিষা, সূর্যমুখী ও চিনাবাদামের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে ভোজ্যতেলে আমদানি নির্ভরতা কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে, যা দেশের টেকসই খাদ্য ব্যবস্থাকে স্বনির্ভর করতে পারে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশে সেচ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিরও ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সেচ ব্যবস্থার কার্যকারিতার দিক থেকে সারফেস ওয়াটার এবং কৃষি খামারে আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমাদের দক্ষতা আরও অনেক বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চলমান প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সেচ সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে নিবিড় চাষাবাদ আরও জোরদার করা সম্ভব। সেচাধীন জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা খাদ্য উৎপাদনকে একটি স্থায়ী সুরক্ষাকবচ দেবে।

একজন কৃষিবিদ ও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আরও কিছু রূঢ় বাস্তবতা আমার চোখে পড়ে। তিন ফসলি জমিতে কোনো নিয়মনীতি না মেনে আবাসন, ইটভাটা বা কারখানা নির্মাণ এখন এক স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। জমি রক্ষার আইন কাগজে-কলমে থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান নয়। অনেক সময় দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে সড়ক বা বাঁধ নির্মাণের ফলে বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা বিঘার পর বিঘা জমিকে চিরতরে চাষের অনুপযোগী করে তুলছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি অতি-মুনাফার লোভের কাছে আমরা প্রতিনিয়ত দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিচ্ছি। এই জমি ধ্বংসের খেসারত ইতিমধ্যেই গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজকে দিতে হচ্ছে। নিজের শেষ সম্বল ফসলি জমিটুকু হারিয়ে প্রান্তিক কৃষকেরা ভিটেমাটি ছেড়ে দলে দলে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন, কেউ আবার নির্মাণ শ্রমিক হয়েছেন—কিন্তু কোনো পেশাই তাদের আগের স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারছে না। শহরে গিয়েও তাদের পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর গ্রামের সেই জমিও আর ফিরে আসছে না। এই দৃশ্য শুধু শিদলাইয়ের কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়; এটি এখন দেশের প্রতিটি গ্রামীণ প্রান্তের প্রতিনিধি চরিত্র। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমলে নিত্যপণ্য আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হবে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকেও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার এই চ্যালেঞ্জগুলো বারবার উঠে আসছে, যা কোনোভাবেই অবহেলার সুযোগ নেই।

এই বাস্তবতায় সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের নতুন করে আশাবাদী করার পাশাপাশি কঠোর সতর্কবার্তাও দেয়। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্বীকার করেছেন যে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন নির্মাণ ও শিল্পায়নের কারণে দেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আবাদযোগ্য জমি হারিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে 'ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিজমি সুরক্ষা আইন, ২০২৬' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অন্যতম। এই আইনটি যুগের দাবি এবং এর সফল বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে আমাদের খাদ্য সার্বভৌমত্ব। একই সঙ্গে এক ফসলি ও দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরের জন্য কৃষকদের উন্নতমানের বীজ, আধুনিক সেচ সুবিধা এবং সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি মন্ত্রী দিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।

উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা কখনো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য ও বেঁচে থাকার ভিত্তিকে ধ্বংস করে হতে পারে না। উন্নয়ন ও কৃষিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ ভাবা বন্ধ করতে হবে; এদের দেখতে হবে পরিপূরক হিসেবে। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের সামগ্রিক 'ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং' বা ভূমি অঞ্চল নির্ধারণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে তিন ও দুই ফসলি জমিকে এই নতুন আইনের অধীনে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করতে হবে। গ্রামীণ ও নগর—উভয় ক্ষেত্রেই অনুভূমিক বা আড়াআড়ি জমি নষ্ট বন্ধ করে বহুতল ভবন বা 'উল্লম্ব আবাসন' নীতি বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সরকারের পরিকল্পিত ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে নতুন কোনো শিল্পকারখানা স্থাপনের অনুমতি কোনোভাবেই দেওয়া যাবে না। কৃষিজমির 'টপসয়েল' বা উপরিভাগের উর্বর মাটি কাটা সম্পূর্ণ অপরাধ হিসেবে গণ্য করে পোড়ানো ইটের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার শতভাগ বাধ্যতামূলক করা দরকার। দেশের অনাবাদী ও পতিত সরকারি খাসজমিগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে ভূমিহীন প্রান্তিক কৃষকদের সমবায়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দিয়ে সেখানে আধুনিক ও যৌথ কৃষির প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে কৃষিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে লাভজনক, আধুনিক ও একটি মর্যাদাশীল পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের তরুণ সমাজ যদি কৃষিতে আসে, তবে প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি ও নিশ্চিত বাজার। কৃষি শিক্ষায় ডিজিটাল প্রযুক্তি যুক্ত করতে হবে, যাতে তরুণরা কৃষিকে 'নতুন স্বপ্ন' হিসেবে দেখে। জলবায়ু-সহিষ্ণু উন্নত বীজ, সাশ্রয়ী সেচ সুবিধা, আধুনিক যান্ত্রিকীকরণ এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করা গেলে তারা জমি বিক্রি করার চেয়ে চাষাবাদেই বেশি আগ্রহী হবেন। নতুন প্রজন্মকে কৃষি-উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আধুনিক প্রযুক্তি ও সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।

কৃষিজমি একবার হারিয়ে গেলে তা কোটি টাকা খরচ করলেও আর ফিরে পাওয়া যায় না। একটি বহুতল ভবন, সড়ক কিংবা কলকারখানা চাইলে অন্যত্র স্থানান্তর বা পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব; কিন্তু হাজার বছরের প্রবহমান পলিমাটি দিয়ে তৈরি প্রকৃতির এই উর্বর অববাহিকা কৃত্রিম উপায়ে একদিনে সৃষ্টি করা অসম্ভব। তাই কৃষিজমি রক্ষা কোনো আবেগীয় বিলাসিতা নয়; এটি আমাদের বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

আজ আমরা যদি নতুন প্রণীত 'ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিজমি সুরক্ষা আইন, ২০২৬'-এর কঠোর ও আপসহীন প্রয়োগ নিশ্চিত না করি, তবে আগামী দিনে খাদ্য আমদানির পরনির্ভরশীলতা আমাদের গ্রাস করবে। তাই সময়ের দাবি—কৃষিজমিকে প্রকৃত অর্থেই 'জাতীয় সম্পদ' হিসেবে বিবেচনা করা, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং সর্বস্তরে গণসচেতনতা তৈরি করা।

মার্কিন রাষ্ট্রনায়ক উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান একদা সতর্ক করে বলেছিলেন, "শহর ধ্বংস হলে তা আবার পুনর্গঠিত হতে পারে, কিন্তু কৃষি ধ্বংস হলে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।" আজ যখন শিদলাইয়ের ফসলি জমি সিমেন্টের নিচে চাপা পড়ছে, দেশের উর্বর মাটিতে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, তখন মনে হয় আমরা এক অন্ধ মোহের পেছনে ছুটে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। বাংলাদেশের টেকসই ভবিষ্যৎ কেবল কংক্রিটের নিষ্প্রাণ শহরে লুকিয়ে নেই; সেই ভবিষ্যৎ স্পন্দিত হচ্ছে আমাদের সবুজ ধানের শীষে, কৃষকের কপালে জমে থাকা শ্রমের ঘামে এবং এই দেশের পবিত্র উর্বর মাটিতে। কৃষিজমি রক্ষা করার অর্থই হলো দেশের খাদ্য সুরক্ষাকে অক্ষুণ্ণ রাখা, জাতীয় অর্থনীতিকে মজবুত করা এবং সর্বোপরি আমাদের আগামী প্রজন্মের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা। আমরা এখনো সবুজ ফিরিয়ে আনতে পারি, যদি যৌথভাবে সচেতন হই, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করি এবং কৃষিকে আবারও আমাদের জাতীয় ভাবনার প্রাণের কেন্দ্রে তুলে আনি। সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল: mbashirpro1986@gmail.com