ভাবুন তো, কর্ণাটকের স্টেডিয়ামে এসে দাঁড়ালেন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। হাত তুলে ঘোষণা করলেন, ‘হিন্দি একমাত্র, হিন্দই হবে ভারতের রাষ্ট্রভাষা!’ মুহূর্তেই কর্ণাটক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা না না ধ্বনিতে ফেটে পড়ল। জিন্নাহ সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন, তড়িঘড়ি সভা ছেড়ে চলে গেলেন।

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের কথিত চিত্রনাট্যকে যদি ভারতের অহিন্দি ভাষী কোনো এলাকায় স্থাপন করা হয়, তবে এমন দৃশ্যই হয়তো দেখা যেত। সম্প্রতি ফিনান্সিয়াল টাইমসের সাংবাদিক ব্যাংগালুরু বিমানবন্দরে নিজের অভিজ্ঞতার যে বিবরণ দিয়েছেন, তা শুনে বোঝাই যায় যে ভারতের দক্ষিণে হিন্দির বিরুদ্ধে ক্ষোভ কতটা তীব্র।

ঘটনা শুরু হয় ব্যাংগালুরু বিমানবন্দর থেকে। সাংবাদিক ক্রিস কে-র ফ্লাইট ছিল মুম্বাইয়ের দিকে। ডিপারচার বোর্ডে ফ্লাইটের তথ্য দেখা গেল ইংরেজি আর কর্ণাটকের প্রধান ভাষা কন্নড়ের সুন্দর বাঁকানো হরফে। কিন্তু চোখে পড়ল না হিন্দি! এই হিন্দি-অন্তর্হিতি নিয়ে করা এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ভাইরাল হয়ে গেছে গোটা ভারতে। এই পোস্ট যেন দেশের ভাষা-সংবেদনশীল স্নায়ুতে আঘাত করেছে। কারণ ভারতের ২২টি সরকারি ভাষার মধ্যে হিন্দিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, আর এর বেশিভাগ বক্তা উত্তর ভারতে- যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতার ঘাঁটি।

কিন্তু ভারতের দক্ষিণে, যা তুলনামূলকভাবে বেশি সমৃদ্ধ এবং যেখানে বিরোধী দলগুলোর নিয়ন্ত্রণ শক্ত, সেখানে হিন্দি ঠেলে দেয়ার চেষ্টা মানেই বিরোধিতা, এমনকি তীব্র ঘৃণা। বহুদিন ধরেই দক্ষিণ ভারতের মানুষ মনে করে, মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) হিন্দি চাপিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে ড্রাবিড়িয়ান ভাষাগুলোকে কোণঠাসা করতে চাইছে।

ভারতের স্বাধীনতার পর প্রথম দশকেই হিন্দি রাষ্ট্রভাষা করার সরকারি প্রচেষ্টা দক্ষিণে প্রবল আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। ১৯৬৫ সালের ‘অ্যান্টি-হিন্দি আন্দোলন’ থেকে শিক্ষা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার পরে সংবিধানে স্পষ্ট করে দেয়, হিন্দি ও ইংরেজি- উভয় ভাষাই চলবে। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলো হিন্দি-বলয়ের ভোটের জন্য প্রায়ই হিন্দিকে ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে। এই মনোভাব দক্ষিণে আবার নতুন করে আতঙ্কের জন্ম দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভাষা কেবল কথার মাধ্যম নয়, বরং সংস্কৃতি, পরিচয় আর রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক। ড্রাবিড়িয়ান ভাষাগুলো (যেমন তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালয়ালম) এবং উত্তর ভারতের ইন্দো-আর্য ভাষাগুলো একে অপরের থেকে ভিন্ন ভাষাপরিবারে পড়ে। ফলে ভাষার বিরোধ এখানে কেবল মনের বা আবেগের নয়, গভীর সাংস্কৃতিক বিভাজনও তুলে ধরে।

এ যুদ্ধ কিন্তু কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাংগালুরুতে প্রোকন্নড় কর্মীরা এমন দোকানেই হামলা চালিয়েছেন, যেখানে কন্নড় সাইনবোর্ড নেই। গত মাসে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার এক শাখার কর্মীর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দেখা যায়, তিনি গ্রাহকের সাথে কন্নড়ে কথা বলতে অস্বীকার করছেন। ভিডিওটি ভাইরাল হতেই কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া কড়া বার্তা দেন। এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লেখেন, ‘স্থানীয় ভাষাকে সম্মান করা মানে মানুষের সম্মান করা। #কন্নড়প্রথম’

কেবল এক নামে পরিচিত সিদ্ধারামাইয়া দক্ষিণ ভারতের ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যের সবচেয়ে সোচ্চার রক্ষক। তার সরকার কর্ণাটকে দোকানপাট-রাস্তাঘাটের ৬০ ভাগ সাইনবোর্ড কন্নড়ে রাখতে বাধ্যতামূলক করেছে। এমনকি গত বছর প্রস্তাব দিয়েছিল, বেসরকারি খাতে অর্ধেক চাকরি স্থানীয় কন্নড়ভাষীদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। এই প্রস্তাব ব্যাংগালুরুর টেক ইন্ডাস্ট্রিতে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে- কারণ দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা কর্মীরাই এই শহরের মূল চালিকাশক্তি, তাই সেটি স্থগিত করা হয়।

জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক আয়েশা কিদওয়াই বলেন, ‘ইতোমধ্যেই প্রচুর উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার বণ্টনের সাথে জড়িত।’

তার কথায়, প্রশাসনিক দিক থেকেও ‘এত ভাষার দেশে আসলে একটা প্রকৃত সমস্যা রয়েছে- মানুষকে কিভাবে সেবা পৌঁছে দেয়া হবে?’

ভারতের সুবিশাল উপমহাদেশ জুড়ে অসংখ্য ভাষার কারণে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর কেন্দ্র সরকার হিন্দি প্রচারের চেষ্টা শুরু করেছিল, যা দক্ষিণে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এ বছর সেই পুরনো যুদ্ধ যেন নতুন করে শুরু হয়েছে। কারণ নয়াদিল্লি তামিলনাড়ুকে জাতীয় ‘তিন-ভাষা নীতি’ কার্যকর করতে চাপ দিচ্ছে। এই নীতিতে রাজ্য স্কুলে ছাত্রদের ইংরেজির সাথে দু’টি ভারতীয় ভাষা শিখতে হয়। তামিলনাড়ু বহুদিন ধরে বলছে, এতে হিন্দি চুপিসারে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। তামিল রাজ্য সরকারের অভিযোগ, কেন্দ্র শিক্ষা-খাতে বরাদ্দ আটকে রেখে তাদের উপর চাপ বাড়াচ্ছে।

এপ্রিল মাসে মোদি তামিলনাড়ুর রাজনীতিকদের ইংরেজিতে চিঠি লেখার জন্য বিদ্রুপ করেন। জবাবে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘মৌচাকের দিকে ঢিল ছোড়ার চেষ্টা করবেন না।’

এই সঙ্ঘাতের পেছনে গভীর রাজনৈতিক শঙ্কাও লুকিয়ে আছে। মোদির সরকার ২০২৭ সালের আদমশুমারির পর সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিয়েছে। এতে সংসদীয় ক্ষমতার ভার উত্তর ভারতের দিকে আরো সরতে পারে, যা বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। ফলে দক্ষিণের রাজ্যগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। কারণ এখানেই ভারতের শিল্প-শক্তির বড় অংশ, উন্নয়ন সূচকও ভালো, তবু দিন দিন তাদের কেন্দ্রে গুরুত্ব কমছে বলেই মনে করছে দক্ষিণ। তামিলনাড়ুর স্ট্যালিন ফিনান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ‘বিজেপি আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ করছে।’

ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র যেদিকেই যাক, ভাষার সঙ্কট ক্রমেই আরো তীব্র হবে। কারণ একদিকে দক্ষিণ ভারতের গর্বিত ভাষা-সংস্কৃতি, অন্যদিকে উত্তর ভারতের হিন্দি-ভিত্তিক রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই বিভাজন ভারতের শহর-গ্রাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। স ইরুদয়া রাজন, কেরালার ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান হিসাব করেছেন- ভারতের শহরাঞ্চলের প্রায় অর্ধেক মানুষ এমন প্রথম ভাষা নিয়ে বাস করছে, যা স্থানীয়দের ভাষার থেকে ভিন্ন।

তবে রাজন নিজেই হেসে বলেন, ‘আমি চার বছর মুম্বাইতে পড়েছি, তবু হিন্দি ভালো বলতে পারি না। ২৫ বছর কেরালায় থেকেও মালয়ালম ভালো পারি না।’

তারপর যোগ করেন, ‘ভাষার আসলে মানে নেই... সবাই নিজেদের স্বার্থে ভাষাকে হাতিয়ার করছে।’

যে দেশে ভাষার বৈচিত্র্য একসময় ছিল শক্তির উৎস, সেখানে এখন সেটাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে বিভাজনের দেয়াল। আজকাল সেই দেয়ালেই প্রতিফলিত হচ্ছে ভারতের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব।