দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে আর্বিভূত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) নেতারা এখন রঙ বদলাচ্ছেন। দলটির গুলশানের সেই বিলাসবহুল কার্যালয় নেই এখন। আর সাংগঠনিক কার্যক্রম গুটিয়ে গেছে নির্বাচনের পরপরই। বিএনএমের উদ্যেক্তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সংগঠনটি নিজেদের কব্জায় নিয়ে ব্যবহার শুরু করলে তারা বের হয়ে আসেন। নির্বাচনের আগে যারা এটির সাথে ছিল তারা শুধুমাত্র আর্থিক ফায়দা নেয়ার জন্যই ছিলেন। 

দলটির চেয়ারম্যান সাবেক আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতা শাহ মো: আবু জাফর বলছেন, ‘গত নির্বাচনে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের ব্যাপারে বর্তমান সরকার নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন। তাই তারা সরকারের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছেন। এছাড়া বিএনএম কোনো কিংস পার্টি নয় বলেও দাবি তার। অফিস বন্ধ নয়, পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।’ 

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, দল গঠনের দু’ বছরের মাথায় ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট নিবন্ধন লাভ করে বিএনএম। দলটি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৎপরতা শুরু করে। যেকারণে শুরু থেকেই দলটি ‘কিংস পার্টি’ নামে পরিচিতি পায়। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপির সাবেক দু’ নেতা। কার্যত বিএনপিকে বিভক্ত করতেই এই উদ্যোগ বলে অভিযোগ বিএনপি নেতাদের। 

বিএনএমের শুরুর সময়কার আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুর রহমান ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন তিনি। দলের সদস্যসচিব মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) মো: হানিফ বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য। ২০২১ সালের ২৮ জুন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করার ১০ দিনের মাথায় বিএনএম গড়ে তোলেন তিনি।

হঠাৎ করেই গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দলটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। রাজধানীর মহাখালীতে স্বল্প পরিসরের কার্যালয় থাকলেও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই দলীয় কার্যালয় পরিবর্তন করা হয়। গুলশান-২ নম্বরে বিলাসবহুল কার্যালয়ে কার্যক্রম শুরু করে বিএনএম। সেখান থেকেই মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও প্রার্থী বাছাই করা হয়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখানোর অংশ হিসেবে বিএনপির সাবেক এবং নিষ্ক্রিয় নেতাদের নিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রমে তৎপর ছিল দলটি। 

নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে হঠাৎ করে বিএনএমের নেতৃত্বেও আসে পরিবর্তন। ২০২৩ সালের ২০ নভেম্বর গঠিত নতুন কমিটিতে চেয়ারম্যান পদ শূন্য রেখে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয় সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও পরবর্তী সময়ের বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হওয়া ফরিদপুরের শাহ মো: আবু জাফরকে। তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলটি পরিচালনা করেন। নতুন মহাসচিব ও মুখপাত্র হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. মো: শাহজাহান। 

জানা গেছে, নির্বাচনের আগে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের বাগিয়ে আনতে কাজ করতেন দলটির সাথে যুক্ত বিশেষ বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা। তার মধ্যে ড. কামরুল আহসান ছিলেন অন্যতম। তিনি বিএনএমের বর্তমান কো-চেয়ারম্যান বলে জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান শাহ মো: আবু জাফর। কয়েক দিন আগেও ড. কামরুল আহসান বিএনএমের ইফতার মাহফিলে ছিলেন বলে জানান চেয়ারম্যান। যদিও ড. কামরুল নিজেকে মূখ্য সমন্বয়ক হিসেবে পরিচয় দিতেন। দলীয় ফোরামের পাশাপাশি বিগত সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সাথে দেশ ও বিদেশে কামরুলের বৈঠকের ভিডিও রয়েছে। বিশেষ করে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতা ও বিদেশে টাকা পাচারকারী পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নাফিস সরাফতের সাথে দুবাইয়ে বৈঠক করেন। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদের সাথে কাতারে বৈঠক করেছেন তিনি। কামরুল নিজেকে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বন্ধু পরিচয় দিতেন। বিএনএম নির্বাচনের আগে গুলশানের যে অফিসটি ব্যবহার করেছে সেটি কামরুলের নিজের অফিস বলেও জানা গেছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগেরও কোনো সহানুভূতি না পেয়ে গুলশান অফিসের সেই কার্যক্রম গুটিয়ে নেয় দলটি। নির্বাচনের পর দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ মো: আবু জাফর এবং মহাসচিব ড. মো: শাহজাহান অনেকটাই রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, আর্থিক ফায়দা নিয়ে সরকারকে নির্বাচনী বৈতারণী পার করতে সহযোগিতা করেন তারা। 

২০২৪ সালের ১৩ জুন ব্যক্তিগত কারণে ড. মো: শাহজাহান মহাসচিবের পর থেকে পদত্যাগ করলে ড. আব্দুর রহমান নতুন মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এছাড়া শাহ মো: আবু জাফর ভারপ্রাপ্ত থেকে দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হন। ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কেউ কেউ এখন সরকারের আনুকূল্যে পেতে চেষ্টা করছেন। ড. কামরুল আহসান এখন নিয়মিতই সরকারের দু’ একজন উপদেষ্টার কার্যালয়ে যাওয়া আসা করছেন। সেসব উপদেষ্টার সাথে তার ব্যাপক সখ্যতা বলেও তিনি বিভিন্ন মহলে জাহির করছেন। এছাড়া নিজের ফেসবুকে কখনো বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণ, আবার কখনো রংপুরের শহীদ আবু সাঈদের ভাইয়ের সাথে তোলা ছবি শেয়ার করছেন।

এ ব্যাপারে ড. কামরুল আহসান বলেন, ‘আমি কোন দিন বিএনএমের সাথে যুক্ত ছিলাম না। অথচ দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান শাহ মো: আবু জাফর তাকে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দাবি করেছেন।’

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে সামনে আনার চেষ্টা করলেও আমি আসিনি।’

বিএনএমের দলীয় ফোরামে বৈঠকের ভিডিওয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি পারসোনাল।’ তৎকালীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের পাশাপাশি ও ব্যবসায়ী নাফিস সরাফতের সাথে বিদেশে সফরে ভিডিওর বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘ব্যবসায়ী হিসেবে অনেক সময় দেশের জন্য ফান্ড আনতে কাজ করতে গিয়ে তাদের সাথে বৈঠক করতে হয়েছে।’

বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে পোস্ট দেয়ার বিষয়ে কামরুল বলেন, ‘আমি ‘ম্যাডাম’ খালেদা জিয়ার সিকিউরিটি টিমে কো-অর্ডিনেটর ছিলাম। আমি আগেও তাকে নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছি। তবে, আমি কোনো দলের সদস্যও না।’ 

এদিকে, বিএনএম গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি ও মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) মো: হানিফসহ কয়েকজন মিলে একটা ভালো উদ্দেশ্যে এই সংগঠনটি করতে চেয়েছিলাম। এটি আওয়ামী লীগ ছিনতাই করে কব্জায় নিলে আমি বের হয়ে আসি। ছিনতাইয়ের পর উদ্যেক্তাদের বাদ দিয়ে মো: শাহজাহান মহাসচিব ও কামরুল আহসান মুখ্য সমন্বয়ক বনে গিয়ে তারা সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত যারা এ সংগঠনে ছিলেন তারা সরকারের পারপাস রক্ষায় কাজ করেছেন।’