আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে টার্নওভার ট্যাক্স শূণ্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করা হয়েছে। এই ট্যাক্স পোল্ট্রি খাতের পণ্যের (ডিম ও মাংস) উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিবে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। সস্তা ও সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস হিসেবে পরিচিত ব্রয়লার মুরগির ডিম ও গোশতের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে তা ভোক্তার উপর চাপ তৈরি করবে। খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চিতের জন্য এ খাতের উদ্যোক্তারা পোল্ট্রি খাতের জন্য টার্নওভার ট্যাক্স শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর দাবিও করেন উদ্যোক্তারা।

তারা বলছেন,বিগত কয়েক মাসে প্রতি কেজি ফিডের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে দাম পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারে। অর্থাৎ বাড়বে ফিডের দাম, সেই সাথে ডিম ও মুরগির উৎপাদন খরচ। ইতোমধ্যে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। আর অনেক খামার ও হ্যাচারি বা ব্রিডার খামার বন্ধ হয়ে যাবে। উৎপাদন ও চাহিদার মাঝে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।

শনিবার (১৪ জুন) রাজধানীর বসুন্ধরার রূপায়ন শপিং সেন্টারে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ খাতের উদ্যোক্তারা এসব কথা বলেন। ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফিআব) এর সভাপতি এবং বিপিআইসিসির আহ্বায়ক শামসুল আরেফিন খালেদ, ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার (ওয়াপসা-বাংলাদেশ) সভাপতি মসিউর রহমান, ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) এর সভাপতি মাহাবুবুর রহমান, সহ-সভাপতি এহতেশাম বি. শাহজাহান, বিপিআইসির সাধারণ সম্পাদক এটিএম মোস্তফা কামাল, বিএবির সাধারণ সম্পাদক শাহ্ ফাহাদ হাবীব, বিপিআইসির যোগাযোগ ও মিডিয়া উপদেষ্টা মোঃ সাজ্জাদ হোসেন সহ এ খাতের উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ফিআব এর সভাপতি ও বিপিআইসিসির আহ্বায়ক শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, টার্নওভার ট্যাক্স বেড়ে যাওয়া মানে সেক্টরের পণ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া। আমরা পোল্ট্রি খাতের আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করে খরচ কমানোর যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি, সেটাকে বাধার মুখে ফেলবে টার্নওভার ট্যাক্স। অথচ এই খাতটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রোটিনের সোর্স হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, আমাদের কর্পোরেট ট্যাক্স শূণ্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করা হয়েছে। এতে করে উদ্যোক্তারা চাপে পড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে। এ কারণে আমরা যাতে কম দামে পণ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দিতে পারি সেজন্য টার্ণওভার ট্যাক্স কমিয়ে শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি করছি সরকারের কাছে।

তিনি বলেন, এই টার্নওভার ট্যাক্স বৃদ্ধির কারণে এ খাতের কোম্পানিগুলোর মোট ট্যাক্সের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৫-৫০ শতাংশ পর্যন্ত। তিনি বলেন, এ খাতের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ২-৩ শতাংশ লাভে পণ্য বিক্রি করেন। যেখানে মেডিসিন সেক্টরে এই লাভ অন্তত ২০ শতাংশ। এখন ২০ শতাংশ লাভযুক্ত একটি কোম্পানি, আর ২-৩ শতাংশ লাভ করা একটি কোম্পানির টার্নওভার ট্যাক্স একই রকম হওয়া কোনভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এই বিষয়টি সরকারকে বিবেচনার অনুরোধ করছি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে গত ২ জুন উপস্থাপন করেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। প্রস্তাবিত এই বাজেটে এবারে কর্পোরেট ট্যাক্স ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পোল্ট্রি খাতে কর্পোরেট ট্যাক্স ২০১৫ সাল থেকে ১৫ শতাংশ ছিল।

খাদ্য নিরাপত্তার সাথে জড়িত একটি খাতের হঠাৎ করে কর্পোরেট ট্যাক্স দ্বিগুণ করা হলে সেটিও উৎপাদন খরচের উপর বড় একটি চাপ তৈরি করবে। পোল্ট্রি খাত ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত ট্যাক্স অব্যাহতি খাত হিসেবে ছিল। এর পর থেকে ১৫ শতাংশ হারে কর্পোরেট ট্যাক্স প্রদান করতো।

শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, পোল্ট্রি খাতের কর্পোরেট ট্যাক্স আদায়ে আগে থেকেই এক ধরনের জটিলতা রয়েছে। এই ট্যাক্সটা কোম্পানির লাভ থেকে নেয়ার কথা। কিন্তু এ খাতের যে পণ্য বিক্রি করে লাভ হচ্ছে শুধু সেখান থেকেই কর্পোরেট ট্যাক্স নেয়া হচ্ছে। যেখানে লোকসান হচ্ছে সেখানে ছাড় দেয়া হচ্ছে। অথচ একটি কোম্পানির সবগুলো পণ্যেও লাভ লস হিসাব করে লাভ হলে তার উপর কর্পোরেট ট্যাক্স নেয়ার কথা। টার্গেট করে এ খাত থেকে রেভিনিউ বাড়ানোর চিন্তা করা হলে একটা সংকট তৈরি হবে।

হিসাবের এই জটিলতা দূর এই খাতের কর্পোরেট ট্যাক্স আগের অবস্থায় নিতে না পারলেও অন্তত যেন ২০ শতাংশে নিয়ে আসা হয় সে দাবি করেছেন উদ্যোক্তারা।

এর বাইরে এ খাতের উদ্যোক্তারা ফিড উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে আগাম কর কমিয়ে আনার দাবি করেছেন। উদ্যোক্তারা জানান বর্তশানে ভুট্টা আমদানিতে ২ শতাংশ, সয়াবিন মিল আমদানিতে ৫ শতাংশ পর্যন্ত আগাম কর রয়েছে। এই আগাম কর সরকার পরবর্তীতে সমন্বয় করার কথা বললেও সেটা করে না। নানান জটিলতায় টাকা আটকে থাকে। এ জন্য আগাম কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ থেকে দশমিক ১ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি করেন উদ্যোক্তারা।

ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার (ওয়াপসা- বাংলাদেশ) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, গোশত ও ডিমের দামে দীর্ঘমেয়াদে সহনীয় রাখতে আমরা কাজ করছি। অথচ আমরা যখন এ খাতের আধুনিকায়নের জন্য মেশিনারিশ আনছি তখন আমাদের ব্যপকহারে আমদানি শুল্ক দিতে হচ্ছে। আবার আমাদের কর্পোরেট ট্যাক্স প্রায় দ্বিগুণ করা হলো। অথচ এই সেক্টরের দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার জন্য আমরা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য করমুক্ত খাত হিসেবে পোল্ট্রি সেক্টরকে রাখার দাবি করছি।

কারণ আমরা প্রতি বছর একজন মানুষের গোশতের কনজাম্পশন ২০ কেজি এবং ডিমের কনজাম্পশন ১২২টি থেকে ২০০টিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছি।

বিএবির সহ-সভাপতি এহতেশাম বি. শাহজাহান বলেন, আমরা সুবিধা চাই দামটা সহনীয় রাখতে। কারণ সারাদেশে নদীনালা কমে যাওয়ায় মাছের যোগান কমে গেছে। সরকার এখানে নজরদারি করবে তাতে সমস্যা নাই, কিন্তু অন্য সেক্টরের সাথে মেলালে তা ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই দেশে ২০-২৫ শতাংশ লেয়ার খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এই উৎপাদন আবার বাড়ানোর চিন্তা না করে চাপে রাখার মত সিদ্ধান্ত নিলে সেটা হিতে বিপরীত হয়ে আসবে। যা ভোক্তার উপর চাপ তৈরি কবে।