সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন বিলে শরিয়ার প্রতিফলন নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে ইসলামী দল ও সংগঠনগুলো। সোমবার পৃথক বিবৃতিতে তারা এ দাবি জানায়।

হেফাজত : জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এ বিদ্যমান মুসলিম পারিবারিক ও সামাজিক বিধিব্যবস্থার যাতে কোনো ব্যত্যয় না ঘটে, সে বিষয়ে গভীর নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা শায়খ সাজিদুর রহমান। এক যৌথ বিবৃতিতে হেফাজত নেতৃদ্বয় সরকারের প্রতি এ দাবি জানান। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতার নিরাপত্তা, সুচিকিৎসা ও সম্মানজনক জীবিকা নিশ্চিত করা প্রতিটি সন্তানের জন্য ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলাম পিতা-মাতার হক আদায়কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছে। তাই জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সুরক্ষায় যেকোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। তবে আইনের প্রয়োগ ও শরিয়াহর সামঞ্জস্য নিয়ে আলোকপাত করে তারা বলেন, মুসলমানদের সম্পত্তি বণ্টন, হেবা এবং মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়টি সম্পূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক ফারায়েজ আইনের অধীন। সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন কোনো পদ্ধতি বা ধারা যেন মূল ইসলামী মিরাস ও হেবার বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে একে সাধারণ হস্তান্তর পদ্ধতি বলা হলেও, বাস্তব প্রয়োগে এটি যেন পবিত্র কোরআন-সুন্নাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। হেফাজত নেতৃদ্বয় জোর দিয়ে বলেন, কোনো আইনি জটিলতা বা শরিয়তের সাথে অসঙ্গতি এড়াতে বিলটি চূড়ান্ত করার পূর্বে দেশের বরেণ্য মুফতি, ফকিহ ও ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া সমীচীন। শরিয়াহ বোর্ডের পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে এমন আইনি রূপ দেয়া হোক, যাতে পিতা-মাতার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সুন্নাহসম্মত হেবা ও মিরাসের বিধানও সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: দলটির আমির মাওলানা মামুনুল হক ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ সংসদে তড়িঘড়ি করে পাস করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা যাবে না, যা আল্লাহ তায়ালা নির্ধারিত হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের শরয়ী বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। জীবিত অবস্থায় হেবা এবং মৃত্যুর পর ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকার—দুটি পৃথক বিষয়। নতুন আইন যেন কোনো ওয়ারিশকে তার শরিয়াহ নির্ধারিত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

খেলাফত মজলিস : ইসলামী শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের সাথে অধিকতর পর্যালোচনা এবং প্রকাশ্য মতামত গ্রহণ না করে তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬ গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মন্তব্য করেছে খেলাফত মজলিস। এক বিবৃতিতে খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, এ সিভিল আইনটি বাহ্যতদৃষ্টিতে সুন্দর মনে হলেও, এর মাধ্যমে একজন বা কয়েকজন উত্তরাধিকারীকে বিশেষ সুবিধা দেয়া এবং অন্যদেরকে বঞ্চিত করার হাতিয়ারও হতে পারে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, শরিয়া অনুমোদন করে না এমন আইন বাংলাদেশে আর গ্রহণযোগ্য হবে না।

ইসলামী আন্দোলন: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইন-১৮৮২ এর সংশোধনকল্পে আনীত ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন-২০২৬’ এর সমালোচনা করে বলেন, আইনটি বাস্তবায়নযোগ্য না। কারণ হেবাকৃত সম্পত্তির ওপরে হেবাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা না হলে হেবা সম্পন্ন হবে না। আর হেবা সম্পন্ন না হলে হেবাকারী ব্যক্তির মৃত্যুর পরে সেই সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হবে। এতোসব জটিলতা নিয়ে কোনো আইন হতে পারে না। তিনি আরো বলেন, সম্ভবত গভীরভাবে না ভেবেই আইনটি আনা হয়েছে। সেজন্য সরকারকে বলবো, আইনটি নিয়ে অধিকতর পর্যালোচনা করুন। উলামায়ে কেরাম ও আইনবিদদের সাথে পরামর্শ করুন। প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনুন। কিন্তু সমস্যা সমাধানের নামে কোনো অবস্থাতেই শরিয়াহ অমান্য করা যাবে না।

খেলাফত আন্দোলন: বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন প্রধান আমিরে খেলাফত মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ট্রান্সফার অফ প্রপার্টি ২০২৬’ নামে জাতীয় সংসদে যে বিল পাস করা হয়েছে তা যেন কোরআন-হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় সেদিকে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। কোরআন হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন দেশের জনগণ মেনে নেবে না। প্রয়োজনে দেশের শীর্ষ ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ মুফতী এবং ওলামায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করে এ বিল সংশোধন করার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি : ইসলামী শরিয়াহর সুস্পষ্ট বিধান ও দেশের পারিবারিক-সামাজিক বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনা না করে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস করায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। দলটি বলেছে, বৃদ্ধ মা-বাবার জীবনকালীন নিরাপত্তা ও ভোগাধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মানবিক ও প্রশংসনীয়; কিন্তু একটি মানবিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ইসলামী শরিয়াহর সুস্পষ্ট বিধান এবং ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারীদের অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক যৌথ বিবৃতিতে দলের আমির (ভারপ্রাপ্ত) আল্লামা আবদুল কাইয়ূম সোবহানী ও মহাসচিব মাওলানা মূসা বিন ইযহার এ কথা বলেন।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম: জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এ মুসলমানদের পারিবারিক ও সামাজিক বিধিব্যবস্থার পাশাপাশি শরিয়াহর সুস্পষ্ট বিধানগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। দলটির খাস কমিটির বৈঠকে এ দাবি জানানো হয়। দলের সভাপতি শাইখুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের সভাপতিত্বে ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর পরিচালনায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তারা বলেন, নতুন কোনো আইন বা আইনের কোনো ধারা যেন পবিত্র কোরআন-সুন্নাহ নির্ধারিত মিরাস ও হেবার বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিশেষ করে হেবা ও মিরাসের বিধানকে পাশ কাটিয়ে এমন কোনো আইনি কাঠামো তৈরি করা উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে পারিবারিক বিরোধ কিংবা শরিয়াহবিরোধী সম্পত্তি বণ্টনের পথ তৈরি করে। প্রয়োজনে একটি বিশেষজ্ঞ শরিয়াহ বোর্ডের মাধ্যমে বিলটির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করে শরিয়াহসম্মত প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে।

খতমে নবুওয়াত: জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এর শরিয়াহগত দিক গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মুফতী ও ফকিহদের মতামত গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী। এক বিবৃতিতে তিনি এ উদ্বেগ ও পরামর্শ ব্যক্ত করেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, বিলটির পূর্ণাঙ্গ খসড়া দেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতি, ফকিহ ও ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়ে লিখিত মতামত নেয়া হোক। পর্যালোচনায় শরিয়াহর কোনো বিধানের সাথে অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে তা সংশোধন করতে হবে।

ছাত্রশিবির: জাতীয় সংসদে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর বিধানের পরিপন্থী ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল–২০২৬’ পাসের মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। একইসাথে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী ও ধর্মীয় মূল্যবোধ পরিপন্থী বিলটির বিতর্কিত ধারা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, ইসলামের শাশ্বত উত্তরাধিকার আইনের বিষয়ে কোনো স্বীকৃত ফকিহ, মুফতি ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞের মতামত না নিয়ে আইনমন্ত্রী নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে তড়িঘড়ি করে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন পাস করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ইসলামের মৌলিক বিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। অথচ ক্ষমতায় যাওয়ার আগে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী কোনো আইন করা হবে না এবং মদিনা সনদের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে বলে শাসকগোষ্ঠী গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ইতোপূর্বেও আমরা দেখেছি বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শরিয়াহ আইনকে মধ্যযুগীয় আইন বলে কটাক্ষ করেছেন। আমরা স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, এ দেশে ইসলামের মৌলিক বিধানের পরিপন্থী কোনো আইনই মেনে নেয়া হবে না।