পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোতে ফার্মাসিস্টদের বিকল্প নেই। কেন না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী ডাক্তার-ফার্মাসিস্ট-নার্স এ মডেলটি উন্নত স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র গ্রহণযোগ্য মডেল। প্রতি ২৫ শয্যার হাসপাতালের জন্য একজন করে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।

শুক্রবার (২ মে) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্যসেবায় হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা এবং সরকারি হাসপাতালে নিয়োগদানের জন্য অংশীজনদের সাথে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের হাসপাতাল ফার্মাসি কমিটির সভাপতি মো: নাসের শাহরিয়ার জাহেদীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা: মো: সায়েদুর রহমান। এছাড়া বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ ফার্মাসি কাউন্সিলের সভাপতি মো: সাইদুর রহমান এবং ফার্মাসি কাউন্সিলের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান। সভায় মূল প্রবন্ধ (আন্তর্জাতিক) উপস্থাপন করেন ড. ইউ লি চ্যাং এবং মূল প্রবন্ধ (জাতীয়) উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ নসরুল্লাহ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলো গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নেই। যা একটি উদ্বেগজনক বিষয়। বাংলাদেশে ৬৫৪ টি সরকারি হাসপাতাল মোট শয্যার সংখ্যা ৫১ হাজার ৩১৬। এ বিপুল সংখ্যক হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও হেলথ টেকনোলজিস্ট থাকলেও একজনও গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নেই। এতে করে ভুল মাত্রা বা মানের ওষুধ সেবনে অনেকেই দীর্ঘদিন রোগে ভুগছেন। এমনকি ওষুধের মাত্রা সঠিক না হওয়ায় সুস্থ হওয়ার বদলে রোগী মারাও যাচ্ছেন।’

মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে ফার্মাসিস্টরা বিপ্লব ঘটিয়েছে। বর্তমানে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রতি বছর প্রায় ৯৮ শতাংশ দেশীয় ওষুধের চাহিদা মিটিয়েও পৃথিবীর ১৬০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করছে।

মো: সায়েদুর রহমান বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হতে গেলে সবার আগে ফার্মাসিস্টদের মানুষিকতা বদলাতে হবে। নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যেই সরকার সাত শ’ ওষুধের দোকান খোলার উদ্যোগ নিয়েছে। গরীব মানুষের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ফার্মাসিস্টদের সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকারি হাসপাতালে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।’

নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বলেন, ‘আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ‘হসপিটাল ফার্মাসিস্ট’ ছাড়া গুণগত স্বাস্থ্যসেবা দেয়া আদৌ সম্ভব নয়। আমাদের দেশে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ছাড়াই ওষুধ সংরক্ষণ, ডিসপেন্সিং ও ওষুধ বিতরণ করা হয়ে থাকে। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট হাসপাতালে নিযুক্ত হলে এদেশের হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স ও গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট তাদের পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’

অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, ‘জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬ এর ৪.৩ অনুচ্ছেদে ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদের ‘ঙ’ উপ-অনুচ্ছেদে দেশে পর্যায়ক্রমে সকল সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে হাসপাতাল ফার্মেসি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে (জেলা হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) ওষুধের নিরাপদ সংরক্ষণ, ওষুধের অপব্যবহার রোধ ও যৌক্তিক ব্যবহারে ফার্মাসিস্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

মো: সাইদুর রহমান হাসপাতালে গ্র্যজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘ওষুধের নিরাপদ ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার সার্বিক মান উন্নয়নে হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট (গ্র্যজুয়েট) অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। সরকার ইতোমধ্যে সরকারিভাবে সাত শ‘ ফার্মেসি করার উদ্যোগ নিয়েছে। যেখানে গ্র্যজুয়েট ফার্মাসিস্টদের পদায়ন করা হবে।’