খুলনার পৃথক চারটি স্থানে ঝটিকা মিছিল করেছে আওয়ামী লীগের কর্মীরা। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, খুলনা জেলা শাখার ব্যানার নিয়ে খুলনায় প্রথম কোনো কর্মসূচি পালন করে দলটি।
রোববার (২০) এপ্রিল) বিকেলে মিছিল করার অভিযোগে ওয়ালিদ হাসান ইমন নামের একজনকে নগরীর বয়রা খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ মোড় এলাকা থেকে আটক করা হয়।
অতর্কিত ও ঝটিকা এসব মিছিল শেষে তারাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেয়। মিছিলে দলের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতাকে দেখা না গেলেও কর্মীদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। পতনের মাত্র আট মাসের মাথায় তাদের এই প্রত্যাবর্তনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি। তারা অবিলম্বে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের দাবি জানান। প্রশাসনের অভ্যন্তরে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা এখনো বসে আছে এবং এক্ষেত্রে কোনো সংস্কার কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
ফেসবুকে দেয়া পোস্ট সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৭টার দিকে নগরীর জিরো পয়েন্ট এলাকায় অসংখ্য কর্মী নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। মিছিলের ব্যানারে ছিল শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার ছবি। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান প্রফেসর ড. ইউনুসের বিষোদ্গার করা হয় সেখানে।
এলাকাবাসী জানায়, মিছিলের স্থায়িত্বকাল ছিল কয়েক মিনিট। ভিডিওতে দেখা যায়, মিছিলকারীরা ‘শেখ হাসিনা ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার’, ‘শেখ হাসিনা ফিরবে আবার বীরের বেশে’ ইত্যাদি স্লোগান দেয়।
আওয়ামী লীগ যেখানে মিছিল করেছে তার খুব কাছেই হরিণটানা থানা। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ খাইরুল বাশার বলেন, ‘উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শহরে এসে ঝটিকা মিছিল করে পালিয়ে যায়। সকালের দিকে হওয়ায় সে সময় রাস্তাঘাট অনেকটা ফাঁকা ছিল। ফুটেজ দেখে তাদেরকে গ্রেফতার করতে পুলিশের টিম কাজ করছে।’
এদিকে দুপুর আড়াইটার পর আড়ংঘাটা থানাধীন এলাকায় আবু নাসের মোড় থেকে আওয়ামী লীগের আর একটি মিছিল বের হয়ে দেযঅরা দিকে চলে গেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়। ব্যানার ছাড়াই অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী মিছিলে অংশ নেন। প্রায় একই সময়ে নগরীর দৌলতপুর থানা এলাকায় আরো একটি মিছিল বের হয়। বিকেলে বয়রা বাজার থেকে আরো একটি মিছিল বের হয়। এই মিছিল থেকে আব্দুল ওয়ালিদ হাসান নিশান নামে একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে জানান সোনাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: শফিকুল ইসলাম। গ্রেফতার নিশান ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ কর্মী বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, জনগণ তাকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।
এনসিপির প্রেস ব্রিফিং
বেলা সাড়ে ৩টার দিকে খুলনা প্রেসক্লাবে প্রেস ব্রিফিং করে নগরীতে আওয়ামী লীগের একাধিক মিছিলের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি। মাত্র আট মাসের মাথায় এভাবে প্রকাশ্যে বের হওয়ার জন্য তারা পুলিশ প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তাকে দায়ি করে বলেছে, সবক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্ভব হয়নি বলেই তারা এই দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এনসিপির সংগঠক হামিম আহমেদ রাহাত ও ডা: আব্দুল্লাহ। এ সময় বিভিন্ন ক্যাম্পাসের ছাত্র সমন্বয়করা উপস্থিত ছিলেন।
তারা বলেন, খুনি হাসিনার দল আওয়ামী লীগের হাতে দু’হাজার শহীদের রক্ত লেগে আছে। শহীদ মুগ্ধ তোরণের খুব কাছে আওয়ামী লীগের এই ফিরে আসা প্রশাসনের দুর্বলতার পরিচয়। তারা সকল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক শক্তির প্রতি মতপার্থক্য ভুলে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এ সময় অবিলম্বে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের খুঁজে গ্রেফতারের দাবি জানান।
ডিসিকে স্মারকলিপি
খুলনা জেলা প্রশাসকের বরাবরে প্রেরিত খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম ডি এ বাবুল রানা ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুজিৎ কুমার অধিকারী সাক্ষরিত একটি স্মারকলিপির কপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার দুপুরের পর ওই স্মারকলিপির কপি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও অন্য নাশকতার দায় থেকে সমন্বয়কারীদের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। তারা পুলিশ হত্যা করেছে, মেট্রোরেলে আগুন দিয়েছে যা তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে। তার মানে আবু সাইদ, মুগ্ধ এবং ওই সময়ে সকল হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সমন্বয়কারীরাই ঘটিয়েছে। অথচ শত শত হত্যা মামলা দিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। যাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আবার গণহত্যার বিচার করবে কিভাবে? আসল খুনি হচ্ছে ইউনূস ও তার দোসররা, যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে।
এতে বলা হয়, ৫ আগস্ট সাংবিধানিক ও নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ও গণতন্ত্র হরণ করে যে জঙ্গিগোষ্ঠী অসাংবিধানিক ও অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল, তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে তথাকথিত গণহত্যার মিথ্যা অভিযোগ এনে একটি নতুন বিকৃত ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চাচ্ছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ আগস্টের পূর্বে দেশে যেকোনো প্রাণহানি এড়ানোর জন্য সকল চেষ্টা করেছেন। তিনি বিক্ষোভ ও সহিংসতা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন যেন কোনো প্রাণহানি না ঘটে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে তিনি যেকোনো সংঘর্ষ ও অস্থিরতার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য আওয়ামী লীগের সকল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ স্থগিত রেখেছিলেন।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, জনগণ দেশ ধ্বংসকারী এই অপশক্তির হাত থেকে বাঁচতে চায়। আমাদের মনে রাখা উচিত, স্বাধীন বাংলাদেশে এ যাবত কয়েক দফা অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক শক্তি আমাদের উপর চেপে বসেছিল। জনগণ এই অগণতান্ত্রিক শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পৃথিবীর অন্য দেশের আদালতের মতো আমাদের সুপ্রিম কোর্টও এই ধরনের অসাংবিধানিক শক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আমরা মনে করি, জনগণের পবিত্র ইচ্ছার প্রতিফলন এই সংবিধান এবং ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।
এ ব্যাপারে খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কার্যালয়ে কোনো স্মারকলিপি দেয়া হয়নি। তাছাড়া আমাদের কোনো কর্মকর্তাও আওয়ামী লীগের স্মারকলিপি পাননি। এ ব্যাপারে আর কিছু জানা নেই।’