কয়েক বছরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরে আনুমানিক চার কোটি ঘনফুট পাথর লুটপাট করা হয়েছে। বুধবার রাত থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে লুটের পর এখন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থান থেকে ৩৫ হাজার ঘনফুট পাথর উদ্ধার করে সেগুলো সাদা পাথরে পুনঃস্থাপন করা হচ্ছে। এ সময় ভোলাগঞ্জ ও জাফলংয়ে ১৭০টি ট্রাক তল্লাশি করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে।
বুধবার রাত সোয়া ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সিদ্ধান্তের পর গভীর রাত থেকে অভিযানে নামে যৌথ বাহিনী। সিলেট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সিদ্ধান্তকারী সভায় স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, গোয়েন্দা বাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে লুট হওয়া পাথর উদ্ধার করে আগের অবস্থানে নেয়া, পাথর চুরি, লুটের সাথে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার ও আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে যৌথ বাহিনীর সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের আলোকে রাতেই অভিযানে নামে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। ভোলাগঞ্জের বিভিন্ন পাথর ভাঙ্গার মেশিনে এবং সড়ক ও বাসা বাড়ির আশপাশে রাখা লুট করা পাথর উদ্ধার করে তারা সাদাপাথরে ফেলে দেন। এভাবে সাদাপাথরের খালি জায়গা আবার আগের মতো পাথর দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে।
বুধবার দুপুরে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ৩৫ হাজার ঘনফুট পাথর উদ্ধার করে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এসময় শত শত পাথরবোঝাই ট্রাক সড়কে আটকা পড়েছে। যৌথ বাহিনী জাফলং ও ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি থেকে সব ধরনের পাথরবোঝাই ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বৃহস্পতিবার দুপুরে দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসন পাথর লুটপাট ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এরপরও পাথর লুটপাট হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠক করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেছে। দ্রুতই এর ফল দেখা যাবে। যেকোনো মূল্যে পাথরখেকো চক্রের অপতৎপরতা ঠেকানো হবে, ইনশাআল্লাহ।’
এর আগে বুধবার দুপুরে দুদক সিলেট কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রাফী মোহাম্মদ নাজমূস সাদাতের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি তদন্তদল সরেজমিন পরিদর্শন করে অনুসন্ধান শুরু করে। রাফী মোহাম্মদ নাজমূস সাদাত বলেন, এটা মূলত স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব। প্রশাসনের আরো সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল। তাদের আরো কার্যকর ভূমিকা রাখা দরকার ছিল। এছাড়া খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোসহ যেসব বিভাগ এর সাথে যুক্ত তাদের লুট ঠেকাতে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, এখানে কয়েক শ’ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়েছে। পর্যটকরা সাদাপাথরে এসে হতাশ হচ্ছেন। এত সুন্দর পাথরগুলো লুটে নেয়ায় তারা আফসোস করছেন। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়েছে।
কারা এই লুটের সাথে জড়িত- এমন প্রশ্নে দুদক সিলেট কার্যালয়ের উপ-পরিচালক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আশপাশে অনেক স্টোন ক্রাশার মিল। এগুলোতে এখান থেকে পাথর নিয়ে ভাঙ্গা হয়। এছাড়া এর সাথে এখানকার প্রভাবশালী ব্যক্তি, স্থানীয় লোকজন, আরো অনেক উচ্চস্তরের ব্যবসায়ীরা জড়িত বলে শুনতে পাচ্ছি। আমরা এসব তথ্য নিয়ে আরো কাজ করব।’
তিনি আরো বলেন, ‘আজকের পরিদর্শনের প্রতিবেদন প্রধান কার্যালয়ে পাঠাব। তারপর তাদের নির্দেশনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। যারা এই লুটের সাথে যুক্ত তাদের সবাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। এরপর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’