নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আড়াল থেকে বের হচ্ছে। গেল বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর পরই নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান, নজরুল ইসলাম বাবুসহ অনেকেই পালিয়ে যায়।

সোমবার (২১ এপ্রিল) ফতুল্লায় আওয়ামী লীগ ঝটিকা মিছিল বের করলে এ সময় মিছিল থেকে সাতজনকে আটক করে পুলিশ।

এর আগে প্রথমবারের মতো আড়াইহাজারের খাককান্দা এলাকায় শনিবার বিকেলে ঝটিকা মিছিল বের করে দলটির নেতাকর্মীরা। এদিকে কাঁচপুর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ঝটিকা মিছিল বের করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ।

আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কয়েক মাস আগে শহরের বিভিন্ন স্থানে রাতে পোস্টার লাগায়। এখন তারা প্রকাশ্যে মিছিল শুরু করেছে।

আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মিছিল নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। তাদের ধরে পিটুনি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। ছাত্রলীগের মিছিলের পরপরই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে সিদ্ধিরগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় শিবু মার্কেট এলাকায় সোমবার ভোরে ঝটিকা মিছিল করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় সাত জনকে আটক করেছে পুলিশ।

আটক ব্যক্তিরা হলেন ঠিকাদার ও যুবলীগ নেতা আবুল হোসেন (ছাত্র হত্যায় অভিযুক্ত জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর সোহেলের সহযোগী), মোল্লা জাফর, সোহাগ, উজ্জ্বল, শাহালম, তপন, রাসেল। আটক সবাই ফতুল্লার লালপুর এলাকার বাসিন্দা।

ফতুল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলাম জানান, ভোরে শিবু মার্কেট থেকে সাতজনকে আটক করা হয়েছে। আমরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছি ও তাদের নাম ঠিকানা ও এর সাথে আরো কারা কারা সম্পৃক্ত তা নিশ্চিত হতে কাজ করছি। তাদের কেউ রাজমিস্ত্রী কেউ বা অন্য পরিচয় দিচ্ছে। একজন জানিয়েছে, তিনি আগে থেকে আওয়ামী লীগের সকল কর্মসূচিতে যেতেন। আমরা সকলের মোবাইল ও অন্য তথ্য যাচাই করছি।

এদিকে গতকাল সোমবার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের কাঁচপুরে মিছিল করেছে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় মাস্ক ও কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ভোরে সোনারগাঁয়ে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে এই মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পরে মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এ সময় ছাত্রলীগের ২০ থেকে ২৫ জন নেতাকর্মী মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। পরিচয় গোপন করতে প্রত্যেকেরই মুখ কালো মাস্ক কিংবা কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। ভোরে মহাসড়কে দশ থেকে পনেরো মিনিটের মত মিছিল দিয়ে ভিডিও ধারণ করেন তারা। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাত্রলীগের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে ভিডিওটি প্রচার করা হয়।

এর আগে গত শনিবার আড়াইহাজারের খাককান্দা ইউনিয়নে কৃষকলীগের ৫৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মিছিল বের করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল গ্রামের রাস্তা ধরে দু’থেকে তিন মিনিটের জন্য এই ঝটিকা মিছিল বের করে।

জানা যায়, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান মোল্লা সমর্থকরা এই মিছিলটি বের করে। এ সময় আওয়ামী লীগ, কৃষকলীগ ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নামে স্লোগান দিতে দেখা গেছে নেতাকর্মীদের। মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ছাত্র জনতার মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

আাড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: এনায়েত হোসেন বলেন, শনিবার বিকেলে কৃষকলীগের কিছু সমর্থক মিছিল করেছে। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তাদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছে।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেছেন, ‘ইদানীং দেখা যাচ্ছে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা পাশের দেশে থেকে তার নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দিয়ে গুপ্ত ও চোরা মিছিল করছে। আমি মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীদের বলতে চাই, নারায়ণগঞ্জ মহানগরে এই ফ্যাসিস্টের দোসররা কোথায় যেন কোনো গুপ্ত মিছিল ও পিকেটিং করতে না পারে।

তিনি আরো বলেন, আপনারা যার যার ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডে সচেতন থাকবেন। যেখানেই এ ধরনের মিছিল হবে সেখানে শুধু পিট্টি আর পিট্টি। কোনো কথা হবে না। তাদের যেকোনোভাবে হোক দমন করতে হবে।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খ সার্কেল) আসিফ ইমাম বলেন, সোমবার সকালে আওয়ামী লীগের ব্যানারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছে। আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি দেখেছি, তবে তা অস্পষ্ট হওয়ায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। তাদের শনাক্ত ও আটকের জন্য পুলিশ মাঠে কাজ করছে।

গত জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিসি অফিসের সামনেসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি স্থানে রাতে পোস্টার লাগায় আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ থাকলেও এখন পর্যন্ত এঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই আওয়ামী লীগ রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ করেছেন ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা।

জামায়াতের নারায়ণগঞ্জ মহানগর প্রচার সম্পাদক হাফেজ আব্দুল মোমিন জানান, ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদ বিরোধী লোকজনের মধ্যে বিভাজন তৈরি হওয়ার নতুন করে অপতৎপরতা শুরু করেছে আওয়ামী লীগের লোকজন। যার ধারাবাহিকতায় তারা মিছিল বের করার সাহস দেখাচ্ছে। ৫ আগস্টে গণহত্যাকারী ও সহযোগীদের বিচার দ্রুততম সময়ে কার্যকর হলে এমন সাহস আর দেখাবে না।