বস্তাপচা রাজনীতি ও ফ্যাসিবাদের কবর হওয়ার নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি : ডা: শফিক
‘হংকং-সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে যাবে কক্সবাজার, মহেশখালীতে হবে স্মার্ট ইকোনমিক জোন’
Printed Edition
কক্সবাজার অফিস ও লোহাগড়া, মিরসরাই সংবাদদাতা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হবে দেশের ৫৪ বছরের ‘বস্তাপচা রাজনীতি’ ও ফ্যাসিবাদের কবর রচনার দিন। তিনি ঘোষণা করেছেন, পচে যাওয়া নেতৃত্ব দিয়ে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। ইনসাফ কায়েম ও ঘুণে ধরা রাজনীতিকে লাল কার্ড দেখাতেই ছাত্র-জনতার আকাক্সক্ষার ‘নতুন বাংলাদেশ’ উদিত হবে। গতকাল সোমবার কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির সোমবার দিনভর ঝটিকা সফরে হেলিকপ্টারে করে কক্সবাজারের মহেশখালী, কক্সবাজার শহর, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া এবং সবশেষে সীতাকুণ্ডে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যজোটের বিশাল সব জনসভায় অংশ নেন। প্রতিটি জনসভাই কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতিতে জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
ফ্যাসিবাদ ও ‘হ্যাঁ’ ভোট নিয়ে কড়া বার্তা : ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং সুশাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নির্বাচন। যারা জুলাইবিপ্লবের বীরদের চেতনা ধারণ করে না, তরুণরা তাদের সাথে নেই।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বগলের নিচে ঋণখেলাপি রেখে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কথা বললে পেঁচাও হাসবে। জনগণ এত বোকা নয়।’ গতকাল কক্সবাজার শহরের গোল চত্বর মাঠে আয়োজিত সমাবেশে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন।
গণভোট প্রসঙ্গে লোহাগড়া উপজেলার এক জনসভায় তিনি বলেন, যারা সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে অবস্থান নেবে, জাতি ধরে নেবে তারা আবার ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়। তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আমরা ১৮ কোটি মানুষের সামনে বুক ফুলিয়ে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলছি। আপনারা কেন লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলেন? কেন আপনাদের কণ্ঠ পরিষ্কার নয়? তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যারা জুলাইযোদ্ধাদের উপহাস করছে, তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। ডাকসু ও জকসু নির্বাচনের ফলাফলই তার প্রমাণ।
নারীদের মর্যাদা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার : সাম্প্রতিক সময়ে নিজের ফেসবুক পোস্ট এবং নারী নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের জবাবে সীতাকুণ্ড পৌরসদরের সমাবেশে ডা: শফিক বলেন, ‘মায়েরা আমাদের মাথার তাজ। তাদের সর্বোচ্চ সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে হবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, তার দুর্নীতির বিরোধী অবস্থানের কারণে একটি বিশেষ পক্ষ তার পেছনে লেগেছে। এনসিপি নেত্রী ডা: মাহমুদা মিতুকে নিয়ে সাইবার বুলিংয়ের কঠোর সমালোচনা করে কক্সবাজারের সমাবেশে ডা: শফিক বলেন, নারীদের অপমান করা চরম ইতরশ্রেণীর কাজ। আমরা মিতুদের কথা দিচ্ছি, নতুন বাংলাদেশে মায়েরা ঘরে ও কর্মস্থলে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও নিরাপত্তা পাবেন।
অন্য দিকে সীতাকুণ্ডের জনসভায় তিনি আরো বলেন, আগে স্লোগান ছিল ‘আমার ভোট আমি দেবো, তোমার ভোটও আমি দেবো।’ এবার তা হতে দেয়া হবে না। যারা দস্যিপনা করতে আসবে, তাদের হাত গুটিয়ে দেয়া হবে।’
যুবসমাজ ও বেকারত্ব নিয়ে পরিকল্পনা : কক্সবাজারের সমাবেশে তরুণদের উদ্দেশ্যে জামায়াত আমির বলেন, আমরা যুবকদের হাতে অপমানজনক বেকার ভাতা তুলে দিতে চাই না। আমরা তাদের হাতকে দক্ষ ও মজবুত করে সম্মানের কর্মসংস্থান দিতে চাই। যুবকরাই আমাদের অহঙ্কার। তারা যখন বলবে ‘আমিই বাংলাদেশ’, তখনই আমাদের সার্থকতা। তিনি ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে যুবকদের এক নতুন বাংলাদেশের দায়িত্ব বুঝে নেয়ার আহ্বান জানান।
আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সিঙ্গাপুর মডেল : মহেশখালীর জনসভায় ডা: শফিকুর রহমান প্রতিশ্রুতি দেন যে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মহেশখালীতে একটি ‘স্মার্ট ইকোনমিক জোন’ গড়ে তোলা হবে। আধুনিকায়ন করা হবে লবণ শিল্পকে। তিনি স্বপ্ন দেখান, সৎ নেতৃত্বের মাধ্যমে পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে সিঙ্গাপুর কিংবা হংকংয়ের চেয়েও উন্নত নগরীতে রূপান্তর করা হবে। এ ছাড়া সোনাপুর থেকে রামগতি-কমলনগর হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেললাইন ও নদীবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।
জোট নেতাদের তীব্র সমালোচনা : জনসভাগুলোতে ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতারাও বক্তব্য রাখেন। জাগপা সহসভাপতি রাশেদ প্রধান বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খানের ‘ছাত্রদের নির্বাচনে যুক্ত করা যাবে না’ শীর্ষক বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ছাত্ররা জুলাইবিপ্লব না করলে খালেদা জিয়ার জানাজা পড়ার সুযোগও পেতেন না আপনারা। লন্ডন থেকে আসা নতুন মুফতিও দেশে পা রাখতে পারতেন না।’ ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ অভিযোগ করেন, বিএনপি নিজেদের শত শত নেতাকর্মীকে খুন করেছে, তাদের হাতে মানুষের জীবন নিরাপদ নয়।
এ দিকে কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মাঠে (গোলচত্বর মাঠ) আয়োজিত বিশাল জনসভায় ডা: শফিকুর রহমান দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সুশাসন নিয়ে এক যুগান্তকারী রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রাজার ছেলে রাজা হোক- এ রাজনীতির আমরা বিরোধী। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে একজন রিকশাচালক শ্রমিকের মেধাবী সন্তানও দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে।’
বিগত বছরগুলোর বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘অতীতের অনেক বিষয়ে আমরা নমনীয় হলেও আবু সাঈদ ও আবরার ফাহাদের হত্যাকারীদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না। শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির খুনিদের জন্য আমাদের কোনো মায়া-দয়া নেই। এদের বিচার হতেই হবে।’ তবে তিনি নিশ্চিত করেন যে, প্রতিশোধের রাজনীতি নয় বরং ইনসাফ কায়েমই তাদের মূল লক্ষ্য এবং কারো ওপর অবিচার করা হবে না।
সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাদের প্রতি বার্তা : প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে আমলাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘কোন আমলে কে নিয়োগ পেয়েছে, তা দেখে কাউকে বাদ দেয়া হবে না। আমরা পেছনের দিকে নয়, সামনের দিকে তাকাতে চাই। সরকারি অফিস কোনো দলের ঠিকানা হবে না। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা হবে জনগণের সেবক।’ তবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।
পাচারকৃত টাকা উদ্ধার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা : দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে বড় ঘোষণা দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘দেশ থেকে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে, চোরদের পেটের ভেতর থেকে সেই টাকা বের করে আনা হবে এবং তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া হবে।’ কক্সবাজারকে হংকং বা সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে তিনি বলেন- অসৎ ও ব্যাংক ডাকাতদের কারণেই এই অপার সম্ভাবনার জনপদ এত দিন পিছিয়ে ছিল। এ ছাড়া কক্সবাজারে শুধু সার্টিফিকেট তৈরির ফ্যাক্টরি নয়, বরং মডার্ন ও প্রফেশনাল এডুকেশন নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক মানের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
নারীদের শিক্ষা ও নিরাপত্তা : নারীদের কল্যাণে বিশেষ ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মেয়েদের মাস্টার্স পর্যন্ত শিক্ষা খরচ সরকার বহন করবে। এ ছাড়া ঘর, রাস্তা ও কর্মস্থলে নারীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
প্রার্থী পরিচিতি ও প্রতীক হস্তান্তর : বক্তব্য শেষে ডা: শফিকুর রহমান বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। লোহাগাড়ায় তিনি চট্টগ্রাম-১৪ আসনের জন্য এলডিপি সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমেদ বীরবিক্রমের ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুকের হাতে ‘ছাতা’ প্রতীক তুলে দেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শাহজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার-২ আসনে ড. হামিদুর রহমান আযাদসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ১২টি আসনের প্রার্থীদের হাতে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক তুলে দেন।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জামায়াতের আমির আলাউদ্দিন শিকদার, দক্ষিণ জেলা আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী এবং কক্সবাজার জেলা আমির মাওলানা নূর আহমদ আনোয়ারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এসব সভায় আরো বক্তব্য রাখেন এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ, জামায়াতের নায়েবে আমির আনম শামশুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগাহ এবং ঢাকসু জিএস এস এম ফরহাদ প্রমুখ।
ডা: শফিকুর রহমান তার বক্তব্য শেষ করেন এই বলে যে, ‘আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। ইনসাফ কায়েম হলে রাষ্ট্রের সম্পদ সবার মাঝে সুষম বন্টন হবে এবং কেউ আর অধিকারবঞ্চিত থাকবে না।’
চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হবে : এদিকে চট্টগ্রাম ব্যুরো জানান, নগরীর বন্দর স্কুল মাঠের জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে চট্টগ্রামকে সত্যিকার বাণিজ্যিক রাজধানী করা হবে। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক রাজধানীর এই বন্দর নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না। তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, মজলুম ছিলেন, এখন জালিম হবেন না। একদিকে মায়েদের গায়ে হাত, অন্য দিকে ফ্যামিলি কার্ড। অপবাদ দিয়ে আমাদেরকে ঠেকানো যাবে না। আমরা যুবসমাজকে স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
বক্তব্য শেষে তিনি চট্টগ্রাম-৯ আসনের প্রার্থী ডা: এ কে এম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম-১০ আসনে অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালি, চট্টগ্রাম-১১ আসনে মোহাম্মদ শফিউল আলম ও খাগড়াছড়ি আসনে অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরীকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনে এনসিপি নেতা জুবাইরুল আরিফের হাতে শাপলাকলি প্রতীক তুলে দেন।